সোমবার, ১৫ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

আধুনিক বাংলা গানের এক কিংবদন্তি শিল্পী

আজ এই কিংবদন্তির তৃতীয় প্রয়াণ দিবস

ভোরের আলো ফুটেছে, চারদিকে আলো ঝলমলে রোদ। সেই রোদের মতোই উজ্জ্বল ও শুভ্র তার সংগীতের মূর্ছনা। সুরে বয়ে চলে অন্যরকম মাদকতা, যা সৃষ্টিকে করে তোলে আরও সুন্দর। বিধি যেন তার কণ্ঠে বেঁধে দিয়েছিলেন মধুর ভান্ডার।

সুবীর নন্দী। আধুনিক বাংলা গানের এক কিংবদন্তি শিল্পী, সুরের রাজকুমার। আজ এই কিংবদন্তির তৃতীয় প্রয়াণ দিবস। দীর্ঘ চার দশকের ক্যারিয়ারে তিনি গেয়েছেন প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি গান। আধুনিক বাংলা গানের জাগরণপর্ব বলা হয় গত শতকের ষাটের দশককে। স্বাভাবিকভাবেই তখন আমাদের দেশে ছিল ভারতীয় বাংলা আধুনিক গানের শিল্পীদের বিস্তর প্রভাব। ঠিক সেই সময়ে আবির্ভাব ঘটে সুবীর নন্দীর মতো গুণী শিল্পীর যারা যাবতীয় প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে নিজেদের সংগীত প্রতিভা ও সাধনাকে কাজে লাগিয়ে সূচনা করেছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানের নতুন এক অধ্যায়ের।

সুরের ভুবনে তার পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। তখন তিনি মাত্র তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। মায়ের কাছে প্রথম গান শেখা শুরু হলেও শাস্ত্রীয় সংগীতে তার গুরু ওস্তাদ বাবর আলী খান। তবে তিনি লোকগানে তালিম নিয়েছেন বিদিত লাল দাসের কাছে। কিশোর বয়সেই তিনি সিলেট বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হয়ে যান, সেখানে প্রথম গান গেয়েছিলেন ১৯৬৭ সালে। প্রথমে শুধু সিলেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৯৭২ সাল থেকে তার ঢাকায় আসা-যাওয়া শুরু হয়। প্রথমদিকে নজরুলগীতি নিয়ে মনোযোগী হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ঝুঁকে পড়েন বাংলা আধুনিক গানের দিকে।

বাংলাদেশ বেতারে তার গাওয়া প্রথম গান ছিল ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’। গানটির সুরকার মীর কাশেম তাকে বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিশেষ করে যখন ১৯৭৬ সালে রাজা হোসেন-সুজয় শ্যামের সুরে আব্দুস সামাদের ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক করার সুযোগ পেলেন। সেই সিনেমায় গাওয়া লোকগান ‘দোষী হইলাম আমি দয়াল রে’ গানটি তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল। একের পর এক নতুন গান রেডিওতে বাজছে, সেগুলোর প্রায় সবই আবার শ্রোতাপ্রিয়ও হচ্ছে। তবে সে সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিল ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন করে’ আর ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম’ গান দুটি। এরপর ১৯৮১ সালে ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে প্রথম একক অ্যালবাম সুবীর নন্দীর গান বাজারে আসে।

সংগীত যে একটা গভীর সাধনার ব্যাপার সেটা সুবীর নন্দীর মতো শিল্পীদের দেখলে বোঝা যায়। গানের পাশাপাশি তিনি ব্যাংকেও চাকরি করতেন, কিন্তু গানের সাধনায় তিনি কখনো কমতি রাখেননি। প্রথমদিকে গান করার সময় জর্দা দিয়ে অনবরত পান খাওয়ার অভ্যাসের কারণে কিছু শব্দের উচ্চারণ নিয়ে সমস্যায় পড়তেন। একদিন প্রখ্যাত সুরকার সত্য সাহার সামনে বসে তিনি গান গাইছিলেন। কিন্তু একটা শব্দের উচ্চারণ ঠিকঠাক কোনোভাবেই হচ্ছিল না। সত্য সাহা তাকে বললেন, “হবে কীভাবে? সারা দিন মুখে পান দিয়ে রাখলে উচ্চারণ বের হবে?” তারপর থেকে নাকি আর কখনো তার মুখে পান দেখা যায়নি।

তার জনপ্রিয় কিছু গানের মাঝে আছে– ‘আমার এ দুটি চোখ’, ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন করে’, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার’, ‘বৃষ্টির কাছ থেকে’, ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’, ‘চাঁদের কলঙ্ক আছে’, ‘ও আমার উড়াল পঙ্খী রে’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘হাজার মনের কাছে’, ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’, ‘সেই দুটি চোখে’, ‘কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়’, ‘তোমারই পরশে জীবন’, ‘বন্ধু তোর বরাত নিয়া’, ‘মাস্টার সাব, আমি নাম-দস্তখত শিখতে চাই’ ইত্যাদি। তার ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য পুরস্কার। একুশে পদক; ৫ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার; সেরা পুরুষ কণ্ঠশিল্পী পুরস্কার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার পেয়েছেন। এ ছাড়াও আজীবন সম্মাননাও পেয়েছিলেন।

চিত্রজগত/সঙ্গীত

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়