বৃহস্পতিবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

যৌথ প্রযোজনায় ছবি (বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাংলার যৌথ নির্মাণ) নির্মাণে ২০১৬-২০১৮ সালে বেশ চাঙা ছিল ঢাকার চলচ্চিত্র। তখন ‘শিকারী’, ‘বাদশা’, ‘নবাব’- পর পর ব্লকবাস্টার হওয়ায় জেগে ওঠে সিনেমাঙ্গন। দর্শকের পাশাপাশি সিনেমা হল মালিকদের মুখে ছিল তৃপ্তির ছাপ!

প্রযোজক থেকে হল-মালিক প্রত্যেকেই লাভবান হচ্ছিলেন। কিন্তু তখনই যৌথ প্রতারণার অভিযোগ তুলে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। অনিয়মের কথা তুলে যৌথ প্রযোজনা ঠেকাতে মাঠে নেমেছিল চলচ্চিত্র পরিবার। তখন বিপত্তিতে পড়ে সুলতান, ভাইজান, নাকাব, চালবাজ ছবিগুলো।

এমনকি যৌথ প্রযোজনার মাধ্যমে ঢাকা-কলকাতা দাপিয়ে বেড়ানো শাকিব খানকে বয়কট ঘোষণা করা হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ বন্ধ হলে দেশের চলচ্চিত্র ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু সেই সুফল কোথায়? দেশের প্রেক্ষাগৃহ বাঁচাতে হল মালিকরা কেন আমদানি করে হিন্দি ছবি মুক্তির দাবি তুলছেন?

এমন প্রশ্ন রেখে এখন অনেকেই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। যৌথ প্রযোজনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগই বলছেন, সেদিন ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তারা। সে কারণেই উপায় না দেখে তারাই এখন সিনেমা হল বাঁচাতে আমদানি করে বাংলাদেশে হিন্দি ছবি মুক্তি দিতে চাইছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকেই স্বীকার করেছেন, শাকিবের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ বন্ধের আওয়াজ জোরদার করা হয়। যৌথ প্রযোজনায় ছবি বানাতো জাজ মাল্টিমিডিয়া। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, “আন্দোলন করে শাকিব খানের ছবি ঈদে আটকে দেয়ার শর্ত দেয়া হয়েছিল। আমরা রাজি হইনি। তাই জাজ আর যৌথ প্রযোজনার সিনেমা নির্মাণে যায়নি। এতে জাজের কোনো ক্ষতি হয়নি, ক্ষতি হয়েছে দেশের শিল্পী ও কলাকুশলীদের।”

পদে পদে ‘প্রতিবন্ধকতা’ এড়াতে যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ বন্ধ করে দেয় জাজ, এমনটাই বলছে দেশের এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় কলকাতার এসকে মুভিজ-এসভিএফও।

যৌথ প্রযোজনার মধ্য দিয়ে ঢাকাই মূল ধারার সিনেমায় নতুন করে যে জোয়ার বইতে শুরু করেছিলো, তা যেনো মুহূর্তেই হতাশায় রূপ নেয়। বাড়তে থাকে মানহীন ছবি। দর্শক অনেকটাই হল বিমুখ হতে শুরু করে। শাকিব খান তখন গণমাধ্যমে বলেছিলেন, যারা আজ নিয়মনীতির বলয়ে যৌথ প্রযোজনায় ছবি বন্ধ করছেন তারাই একদিন হায় হায় করবে!

শাকিবের সে কথাটিই যেন বছর চারেকের ব্যবধানে সত্যি হলো! চলচ্চিত্রের অনেকে সিনেমার সংকট কাটাতে এখন চাইছেন, আমদানি করে দেশের প্রেক্ষাগৃহে ছবি মুক্তি দিতে! কেউ কেউ ভরসা খুঁজছেন, যৌথ প্রযোজনার ছবিতে।

জাজ মাল্টিমিডিয়ার আবদুল আজিজ বলেন, যৌথ প্রযোজনা ও বিদেশে শুটিংয়ের ক্ষেত্রে এখন কঠোর নীতিমালা। এটি আগের মতো সহজ করতে হবে। যৌথ প্রযোজনায় যদি ছবি নির্মাণ আবার বাড়ানো যায় তাহলে আমদানি করে হিন্দি ছবি আনতে হবে না। দেশী হল, শিল্পী ও কলাকুশলীরাও উপকৃত হবে।

প্রযোজক খোরশেদ আল খসরু বলেন, হল টিকিয়ে রাখতে দর্শকদের ফেরাতে বড় আয়োজনের তারকাবহুল ছবি দরকার। এটা যৌথ প্রযোজনার মাধ্যমে সম্ভব। দুই দেশের তারকাদের সমন্বয় করে যদি ছবি বানানো যায় এবং দুদেশে সঠিকভাবে মার্কেটিং করে মুক্তি দেয়া যায় তবে ছবি চলবে।

মধুমিতা সিনেমা হলের মালিক নওশাদ বলেন, এখন পর্যন্ত যতগুলো যৌথ প্রযোজনায় ছবি হয়েছে বেশিরভাগই সফল হয়েছে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, স্বামী কেন আসামী, হঠাৎ বৃষ্টি, মনের মাঝে তুমি, শিকারী, নবাব-এর মত মানসম্মত ছবি যদি দেয়া যায় তাহলে আমদানির প্রয়োজন হবে না।

শিল্পী সমিতির সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ সহজ করা যায় কিনা না জেনে হুট করে মন্তব্য করতে পারবো না।’

পরিচালক সমিতির সভাপতি কাজী হায়াত বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে হবে না। যৌথ প্রযোজনায় ছবি হলে দুদেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে। আমি মনে করি, সিনেমার বাজার ফেরাতে এখন যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ অনেকটা সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।

এদিকে, হিন্দি ছবি আমদানিতে আগামীতে বাংলা সিনেমায় শুভংকরের ফাঁকি’র আশঙ্কা করছেন অনেকেই। তারা বলছেন, একবার হিন্দি ছবি মুক্তি পেতে থাকলে দেশীয় ইন্ডাস্ট্রি রীতিমত কোমায় চলে যাবে। শতকোটির হিন্দি ছবির সঙ্গে মাত্র শোয়া কোটির বাংলা ছবি ধোপে টিকবে না!

উদাহরণ টেনে অনেকে বলছেন, হিন্দির আগ্রাসনে কলকাতার বাংলা ইন্ডাস্ট্রিও এই সমস্যায় মারাত্মকভাবে ভুগছে। শাহরুখ খানের ‘পাঠান’-এর সঙ্গে মুক্তি দিয়ে প্রসেনজিৎ-এর ‘কাবেরী অন্তর্ধান’ নামে একটি ছবি কোনো শো-ই পাচ্ছে না!

চলচ্চিত্রের মানুষদের কথা, হিন্দি ছবি আমদানির চেয়ে যৌথ প্রযোজনার ছবিতে ইন্ডাস্ট্রি লাভবান বেশী হবে। যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মিত হলে বাংলাদেশ থেকে শিল্পী ও টেকনিশিয়ানরা কাজের সুযোগ পাবে। কিন্তু হিন্দি ছবিতে বাংলাদেশের কিছুই থাকবে না। আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় বাংলা ছবি হিন্দির বাজারে কোনো সুবিধাই করতে পারবে না। নাম কাওয়াস্তে দু-একটি ছবি নিলেও তাকে কোনো লাভ হবে না। কিন্তু যৌথ প্রযোজনায় ছবি হলে দু-দেশেরই লাভ হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচালক বলেন, ‘যৌথ প্রযোজনা বন্ধে যে আন্দোলন ছিল ওটা আসলে ছিল শাকিব খানকে আটকানোর কৌশল। তাকে না আটকালে আজ হিন্দি ছবি আনতে হতো না। কারণ, যারা আটকাতো সেইসব পরিচালক ও প্রযোজকরা শাকিবের শিডিউল পাচ্ছিলেন না। একাধিক শিল্পীরাও সেই আন্দোলনে ফ্রন্টলাইনে ছিলেন। তারাও ভালোভাবেই জানতেন তাদের কোনো মার্কেট ভ্যালু নেই। তাই কখনই শাকিবকে কাজ দিয়ে পিছনে ফেলতে পারবে না। এ কারণে তারা ঈর্ষান্বিত ও ব্যক্তি আক্রোশ থেকে চলার পথে নীতিমালার কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছিল।’

আরও একটি দিক উল্লেখ করে সেই পরিচালক নেতা বলেন, অনেকেই যখন বেকার ছিলেন, তখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী চাহিদা সম্পন্ন নায়ক শাকিব খান। এমনকি তিনি ওপার বাংলাতেই জায়গা করে নিচ্ছিলেন। ফলে দুই বাংলাতেই তার ছবিগুলো ভালো ব্যবসা করতো। এখন শাকিব চাহিদার শীর্ষে। যদি নীতিমালা শিথিল বা সহজ করে যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ করা যায়, তবে সবদিক দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রই লাভবান হবে।

চিত্রজগত ডটকম/সিনেমা