মঙ্গলবার, ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

মধুবালা’র জন্মদিন আজ

মমতাজ জাহান দেহলভী (যিনি মধুবালা নামেই বেশি পরিচিত) একজন অন্যতম ভারতীয় অভিনেত্রী, যিনি অনেক হিন্দি ধ্রুপদী চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। আজ তাঁর জন্মদিন। ৮৮ বছর আগে ১৯৩৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা পাকিস্তানের পেশোয়ারের এক টোব্যাকো কোম্পানিতে চাকরি করতেন; কিন্তু তার চাকরি চলে যাওয়াতে সংসারে অভাবের কারণে মধুবালা অভিনয়ে যোগ দেন। এগারো ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম এবং পাঁচ জন মারা যায় খুব ছোটোবেলায়। এরপর তার পিতা বোম্বে শহরে (বর্তমান মুম্বাই) চলে অসেন।

কথিত অছে, মধুবালা যখন খুব ছোট তখন এক দরবেশ তাকে দেখে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে, তিনি জীবনে অনেক খ্যাতি অর্জন করবেন কিন্তু সুখী হতে পারবেন না এবং তিনি অকালে মারা যাবেন। তার সমসাময়িক নার্গিস এবং মীনা কুমারীর বিপরীতে তাকে হিন্দি চলচ্চিত্রের সর্বাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের সর্বাধিক সুন্দর-আকর্ষণীয় অভিনেত্রী হিসেবেও গণ্য হন।

বলিউডের মেরিলিন মনরো বলা হতো তাঁকে। দু’জনের ছবি পাশাপাশি রেখে নানা সময়ে তুলনা করা হয়েছে। তবে তাঁকে চেনানোর জন্য মনরোর প্রয়োজন নেই। সৌন্দর্য, দাপুটে ব্যক্তিত্ব; অথচ সংবেদনশীল অভিনয় তাঁকে করেছে অনন্য। তাঁর সময়ে ছিলেন সবার চেয়ে এগিয়ে। তিনি মধুবালা। সেই মধুবালার বিষাদময় জীবনের গল্প ছাড়িয়ে যায় ‘ট্র্যাজিক সিনেমা’র কাহিনিও।

হ্যাঁ, মাত্র ৩৬ বছর বেঁচে ছিলেন এই তারকা। কিন্তু এই সামান্য সময়ে পরিবার, নিজের কাজ, কাজের ক্ষেত্র, একান্ত ব্যক্তিজীবনের আকর্ষণীয় সব গল্পে অসামান্য করে রেখে গেছেন তিনি। ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর জন্ম, ফেব্রুয়ারিতেই শেষ তাঁর জাগতিক ভ্রমণ। পারিবারিক নাম মমতাজ জাহান বেগম দেহলভী। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে তিনি ফিরে আসেন আলোচনায়, স্মরণে। মূলধারার গণমাধ্যম ছাড়িয়ে তাঁর চর্চা চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি যেমন ফিরে এসেছেন, ফেসবুকে তার প্রমাণ মিলছে বারবার। ভক্তরা যাঁকে রোমান প্রেমের দেবী ভেনাসের সঙ্গে তুলনা করেন, সেই মধুবালা ১৯৩৩ সালের ভালোবাসা দিবসে; অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে জন্মেছিলেন।

হৃদয়ের অসুখ ছিল। ভুগছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। ‘মুঘল-ই-আজম’ মুক্তি পায় ১৯৬০ সালে। তত দিনে মধুবালার শারীরিক অসুস্থতা বেড়ে যায়। হৃদ্‌যন্ত্রের অসুখের বিষয়ে মধুবালাও অবগত ছিলেন। কিন্তু যদি কাজের সুযোগ কমে যায়, এ ভয়ে তাঁর বাবা এটি প্রকাশ করতে দেননি। বিয়ের পরে লন্ডনে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু তত দিনে আর করার কিছু ছিল না। মাসের পর মাস অসুস্থ ছিলেন। একসময় অসুখের কাছে কাবু হয়ে পড়েন মধুবালা। বুকভরা বেদনা নিয়ে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হন বলিউডের সর্বকালের সেরা ‘সুন্দরী’। মুম্বাইয়ের জুহুর মুসলিম কবরস্থান হয় তাঁর শেষ ঠিকানা। যেখানে তাঁর প্রতিবেশী মোহাম্মদ রফি, পারভীন ববি, তালাত মাহমুদরা।

দিলীপ কুমার-মধুবালার বাস্তবজীবনের প্রেম, ভাঙন আর বেদনাবিধুর বিচ্ছেদ যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছিল পর্দার সেলিম-আনারকলির চরিত্রে।

কিন্তু দেহান্তর মানেই নিশ্চিহ্ন বা শেষ হয়ে যাওয়া নয়, ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে যায়নি মধুবালার গল্পটি। মৃত্যুর এত বছর পরও তাঁর জীবনে উঁকিঝুঁকি কম নয়। আজও তাঁর নামের সঙ্গে দুটি উপমা প্রায়ই ব্যবহৃত হয়, ‘বিউটি উইথ ট্র্যাজেডি’ ও ‘দ্য ভেনাস কুইন অব ইন্ডিয়ান সিনেমা’। যুগ যুগ ধরে তাঁর সৌন্দর্যের চর্চা চলছে। শুধু বলিউডেই নয়, এর বাইরেও তাঁর সৌন্দর্যের জয়গান চলে ভক্ত-অনুরাগীর মুখে।

গুগলের ডুডলে শোভা পায় তাঁর ছবি, ডাকটিকিটে তাঁকে সম্মান জানিয়েছে ভারত সরকার। যখন ভারতীয় চলচ্চিত্রে পুরোপুরি রঙের ছোঁয়া লাগেনি, সে সময়ও মধুবালায় উজ্জ্বল, রঙিন ছিল বলিউড। তাঁর বায়োপিকে অভিনয়ের জন্য হালের জনপ্রিয় তারকারা তদবির করেন নির্মাতাদের কাছে।

দেবিকা রানী চৌধুরী, সে সময়ে দাপুটে অভিনেত্রী; তিনিই মমতাজ জাহান বেগমের নাম দেন মধুবালা। স্বল্প কর্মময় জীবনে মধুবালা পৌঁছে যান খ্যাতির শীর্ষে। কিন্তু সুখের দেখা কি পেয়েছিলেন? এমন প্রশ্নে চলচ্চিত্র সমালোচকদের জবাব নেতিবাচক। মধুবালা সুখের দেখা পাননি।

বাবা আতাউল্লা খান পেশোয়ারের পাঠান। সেখানে তামাক কোম্পানিতে চাকরি হারানোর পর তাঁরা ভাগ্যের সন্ধানে পাড়ি জমান বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই)। ১৯৪৪ সালের ১৪ এপ্রিল বোম্বে বিস্ফোরণের ঘটনায় হারিয়ে যায় তাঁদের বস্তির ছোট্ট ঘরটিও। এমন পরিস্থিতিতে শখে নয়, জীবিকার প্রয়োজনে বাবার সংসারে সহায়ক হতে নেমেছিলেন অভিনয়জগতে। ১৯৪৭ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ‘নীল কমল’ সিনেমায় প্রধান অভিনেত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন মধুবালা। নীল কমলের চরিত্রে মধুবালাকে নির্বাচন প্রসঙ্গে পরিচালক কিদার শর্মা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘রূপ কিংবা প্রতিভা নয়, আমাকে তাঁর বুদ্ধি ও পরিশ্রম করার ক্ষমতা প্রভাবিত করেছিল। খেয়ে না খেয়ে তিনি যন্ত্রের মতো কাজ করে গেছেন। ভিড়ে ঠাসা ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণির বগিতে চেপে প্রতিদিন শুটিংয়ে আসতেন। অথচ কখনো দেরি করেননি।’

১৯৪৯ সালে নির্মিত ‘মহল’ সিনেমাটি ছিল মধুবালার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এরপর তাঁর জনপ্রিয়তা এতই বাড়তে থাকে যে মধুবালার তারকাখ্যাতি ভারত পেরিয়ে সাড়া ফেলে হলিউডেও। ১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত থিয়েটার আর্টসে তাঁকে নিয়ে একটি ফিচার প্রকাশিত হয়, যেখানে মধুবালাকে ‘বিগেস্ট স্টার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ বলে অভিহিত করা হয়।

অস্কার বিজয়ী মার্কিন পরিচালক ফ্রাঙ্ক কাপরা তাঁকে দিয়ে হলিউডে অভিনয়ও করাতে চেয়েছিলেন। তাতে অবশ্য মধুবালার বাবা সায় দেননি। যেমনটি দেননি দিলীপ কুমারের সঙ্গে মেয়ের বিয়ের প্রস্তাবেও। ১৯৫১ সালে ‘তারানা’ ছবিতে মধুবালা প্রথমবার অভিনয় করেন দিলীপ কুমারের বিপরীতে। মূলত তখন থেকে বন্ধুত্ব। তাঁরা সংসার করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাবার কারণে এ নিয়ে দিনের পর দিন টানাপোড়েনে ছিলেন এই অভিনেত্রী।

একপর্যায়ে দিলীপ কুমার দুটি শর্ত দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এক. পরিবার ছাড়তে হবে, দুই. অভিনয়ও ছাড়তে হবে। অভিনয় ছাড়ার বিষয়ে অবশ্য দিলীপ কুমারের অন্য যুক্তি ছিল, স্টুডিওর বদ্ধ পরিবেশে মধুবালা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। কারণ, তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রে জন্মগত ছিদ্র ছিল।

অভিনয় ছাড়তে রাজি হলেও, পরিবার ছাড়ার শর্ত মেনে নিতে পারেননি মধুবালা। এরপরই বিখ্যাত গায়ক কিশোর কুমারকে বিয়ে করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে ‘চলতি কা নাম’ গাড়ি ছবির সেটেই তাঁদের পরিচয় হয়েছিল। এর বাইরে আরও কয়েকজনের সঙ্গে মধুবালার প্রেম ছিল। মধুবালার প্রেমে পড়েছিলেন পরিচালক কেদার শর্মা। বয়স বেশি হওয়ার কারণে তাঁর প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। পরিচালক কমল আমরোহীর সঙ্গে মধুবালার সম্পর্কের কথা শোনা গিয়েছিল। শোনা যায় প্রেমনাথের কথাও। তবে কোনো প্রেমই টেকেনি।

তবে ইতিহাস বলছে, মধুবালা জানপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলেন একমাত্র দিলীপ কুমারকে। যেন ‘মুঘল-ই-আজম’-এর সেলিমের প্রেমে সর্বহারা ‘আনারকলি’। এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যের ভিডিওতে দেখা যায়, মধুবালার বোন মাথুর বুশান বলছেন, ‘আমার বোন পাগলের মতো ভালোবাসতেন দিলীপ কুমারকে এবং শুধু দিলীপ কুমারের প্রতি অভিমানে তাঁকে শিক্ষা দিতে কিশোর কুমারের বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। অভিমান, রাগ আর ক্ষোভে আমার বোন কিশোর কুমারকে বিয়ে করেছিলেন।’
জীবনের ট্র্যাজেডি পাশে রেখেই মধুবালা বারবারই পর্দায় ঝলসে উঠেছিলেন। তবে তাঁর নামের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় ‘মুঘল-ই-আজম’ ছবি।

মধুবালা ও দীলিপ কুমার এবং ‘মুঘল-ই-আজম’ এক সূত্রে গাঁথা। ‘মুঘল-ই-আজম’ ছবির শুটিংয়ের শেষে তাঁর হাত-পা নীল হয়ে যেত এবং জেলের দৃশ্যগুলোকে আরও বাস্তবায়িত করে তুলতে তিনি শুট করার সময়ও খাবার খেতেন না।

শোনা যায়, মধু-দিলীপের সম্পর্কের গুঞ্জনের বিষয়টি পুঁজি করতে চেয়েছেন পরিচালক কে আসিফ। তিনি দুই তারকার প্রকাশ্য প্রেমকে হয়তো পর্দায় তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। ৯ বছর ধরে নির্মিত সিনেমাটি আরও বেশ কিছু ঘটনার সাক্ষী। দিলীপ কুমার-মধুবালার বাস্তবজীবনের প্রেম, ভাঙন আর বেদনাবিধুর বিচ্ছেদ যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছিল পর্দার সেলিম-আনারকলির চরিত্রে। শোনা যায়, এ সিনেমার নির্মাণকালে এমন অনেক সময় গেছে, যখন তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে কথাও বলতেন না। যে যাঁর মতো ক্যামেরার সামনে অভিনয় করে গেছেন।

আজীবন ভালোবাসার প্রতীক্ষায় থেকেছেন মধুবালা। তবে প্রেম আর সুখী সংসার ছিল না। শেষ দিনগুলোতে বারবার বলতেন, ‘আমি বাঁচতে চাই’। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান মধুবালা। অসুস্থতার সময় দেখতে না এলেও মারা যাওয়ার পর তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন দিলীপ কুমার।

চিত্রজগত/বলিউড

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়