শুক্রবার, ৩১শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

নায়ক রাজ রাজ্জাকের ৮০তম জন্মবার্ষিকী আজ

তিনি ছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা

ঢাকাই সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেতা নায়ক রাজ রাজ্জাকের ৮০তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জের নাগতলায় জম্ম গ্রহন করেন তিনি। রাজ্জাক বাবা আকবর হোসেন ও মা নিসারুননেসার কনিষ্ঠ সন্তান। রাজ্জাকের জন্ম কলকাতার সিনেমাপাড়া টালিগঞ্জে। অর্থাৎ জন্মের পর থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে সখ্যতা তার।

নায়ক রাজ বলতে বাংলাদেশী এক জনকেই বোঝানো হয় আর তিনি হচ্ছেন ঢাকাই সিনেমার কিংবদন্তী অভিনেতা রাজ্জাক। যে মানুষটি একাধারে একজন অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে সিনেমা অসামান্য ভূমিকা রেখে গেছেন। তিনি কিশোর বয়সে কলকাতার মঞ্চ নাটকে জড়িয় পরেন। মঞ্চের সঙ্গে জড়িত থাকলেও স্বপ্ন ছিলো সিনেমাকে ঘিরে।

এর পর ১৯৬৪ সালে আলে দাঙ্গার উত্তাল সময়ে নতুন জীবন গড়তে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে রাজ্জাক পরিবারসহ ঢাকায় চলে আসেন প্রায় অসহায় অবস্থায়। কঠোর পরিশ্রম আর জীবনের প্রতিটি মূহুর্তের সাথে সংগ্রাম করে ‘নায়ক রাজ’ উপাধি পেয়েছেন। তবে রাজ্জাক তৎকালীন সময়েও দর্শকের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। আর এই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন পাকিস্তান টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ নামের ধারাবাহিক নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়। জীবনে নানা সংগ্রামের পথ অতিক্রম করেছেন তিনি।

আব্দুল জব্বার খানের সহযোগিতায় তিনি সিনেমায় কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। ‘উজালা’ ছবিতে কাজ শুরু করেন পরিচালক কামাল আহমেদের সহকারী হিসেবে। এর পর সালাউদ্দিন প্রোডাকশন্সের ‘তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেন’ সিনেমায় একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করে সবার কাছে নিজ মেধার পরিচয় দেন রাজ্জাক। পরবর্তীতে ‘কার বউ’, ‘ডাক বাবু’, ‘আখেরী স্টেশন’সহ আরও বেশ ক’টি সিনেমায় ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন।

পরে ‘বেহুলা’ সিনেমায় সুচন্দার বিপরীতে নায়ক হিসেবে উপস্থিত হন ঢাকাই সিনেমায় এবং সবার মন জয় করে নেন। দর্শকের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি নায়ক রাজ হিসেবে পরিচিতি পান। ‘কি যে করি’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
২০১১ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনি আজীবন সম্মাননা অর্জন করেছেন। চার বার জাতীয় সম্মাননা লাভ করেন।
রাজ্জাক দেশীয় সিনেমার কিংবদন্তী হয়েছেন, এটা কারো কারো কাছে গল্প বলে মনে হতে পারে। মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। রাজ্জাক অসীম মনোবল, অমানষিক পরিশ্রম আর মমতার মাধ্যমে ঠিকই নিজের লক্ষ্যে পৌঁছেছেন।

টালিগঞ্জের সিনেমাশিল্পে তখন ছবি বিশ্বাস, উত্তম কুমার, সৌমিত্র, বিশ্বজিতদের যুগ। সেখানে হালকা-পাতলা সাধারণ রাজুর অভিনয় সুযোগ পাবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। এর মধ্যে শুরু হলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এক সময় কলকাতায় থাকাটাই মুশকিল হয়ে পড়ে। তখন এক সুহৃদ রাজ্জাককে পরামর্শ দিলেন ঢাকায় চলে আসতে। বললেন, ঢাকার চলচ্চিত্র নতুন করে যাত্রা শুরু করতে। সেখানে গেলে হয়তো কিছু একটা হবে। ভদ্রলোক ঢাকার প্রথম সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’-এর প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা আবদুল জব্বার খানের পরিচিত। তিনি রাজ্জাককে পাঠালেন তাঁর কাছে একটা চিঠি দিয়ে। তিনি রাজ্জাককে বলে দিলেন ঢাকার কমলাপুরে থাকেন আবদুল জব্বার খান। তখন রাজ্জাক প্রথম এসে কমলাপুরে বাসা নেন। এর পর চিঠি নিয়ে জব্বার খানের কাছে যান, তিনি রাজ্জাককে ‘একবাল ফিল্ম লিমিটেড’-এ কাজ করার সুযোগ করে দেন। ‘উজালা’ সিনেমার মধ্যদিয়ে শুরু হল রাজ্জাকের ঢাকার চলচ্চিত্র জীবন। পরিচালকের পাশাপাশি বেশ কিছু সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন। এগুলোর মধ্যে- ‘ডাক বাবু’, ‘১৩নং ফেকু ওস্তাগার লেন’, ‘আখেরী স্টেশন’ উল্লেখযোগ্য।

পর্যায়ক্রমে তিনি জহির রায়হানের সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দান করেন। আর তখন থেকেই তার ভাগ্য খুলে যায়। সহকারী হিসাবে কয়েকটি ছবি পরিচালনা করার পর হঠাৎ এক দিন তিনি নায়ক হওয়ার সুযোগ পান। লোক কাহিনী নিয়ে জহির রায়হান তখন ‘বেহুলা’ নির্মানের উদ্যোগ নেন। জহির রায়হান রাজ্জাককে বললেন, ‘আপনিই আমার ছবির নায়ক।’ ঐসময় রাজ্জাকের চেহারার মধ্যে কলকাতার বিশ্বজিৎ-এর ছায়া খুঁজে পাওয়া যেতো। জহির রায়হানের সুনিপুণ হাতের ছোঁয়ায় অসাধারণ লক্ষ্মীন্দর হয়ে দর্শকদের সামনে উপস্থিত হলেন রাজ্জাক। তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন অপূর্ব সুন্দরী বেহুলারূপী সুচন্দা।

বেহুলা ছবিটি ১৯৬৬ সালে মুক্তি পায়। ছবিটি সুপার হিট হয়। এই ছবির মধ্যে দিয়েই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পায় আরেকজন নায়ক, যিনি হয়ে উঠেন একসময় এদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অপরিহার্য নায়ক। ঢাকার সিনেমা হলগুলোতে তখন পাক-ভারতীয় ছবির দাপট। পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী, জেবা, সুধির, শামীম আরা, ওয়াহিদ মুরাদ এবং কলকাতার ছবি বিশ্বাস, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, বিশ্বজিৎ, সৌমিত্র এবং ভরতের রাজ কাপুর, নার্গিম, দিলীপ কুমার এদের ছবির সঙ্গে পালা দিয়ে চলতে শুরু করল ঢাকার নির্মাতাদের নির্মিত ছবি। আব্দুল জব্বার খান, রহমান, শবনম, খলিল, ফতেহ লোহানী, খান আতা, সুমিতা দেবী, আনোয়ার হোসেন, সুচন্দা তাদের সাথে আরো একটি নাম যুক্ত হলো- আর তিনি হলেন রাজ্জাক।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এখানে নির্মিত বেশিরভাগ সিনেমার নায়কই রাজ্জাক। ‘দুই ভাই’, ‘আবির্ভাব’, ‘বাঁশরী’, ‘এতটুকু আশা’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘পায়েল’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘যোগ বিয়োগ’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘মধুর মিলন’ ইত্যাদি ছবির সাফল্যে রাজ্জাক হয়ে ওঠেন ঢাকাই সিনেমার অপরিহার্য নায়ক, নায়ক রাজ।

বাংলাদেশ যখন পাকিস্তান থেকে ভাগ হয়ে যায় তখন বাংলাদেশে পাক ভারতীয় সিনেমার প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যাদের উপর দায়িত্ব পরে রাজ্জাক তাদের মধ্যে একজন। এর পর সড়ক দুর্ঘটনায় রহমান পা হারালে রোমান্টিক নায়কের শুন্যতা দেখা দেয়। তখন রাজ্জাক একাই তা সামাল দেন। খুব দক্ষতা এবং নৈপুন্যতার সাথে রাজ্জাক একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে যান।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম মুক্তি পায় রাজ্জাক অভিনীত মোস্তফা মাহমুদ পরিচালিত ‘মানুষের মন’। ছবিটি ব্যবসা সফল হওয়ার কারণে নতুনভাবে বাংলাদেশের সিনেমা জেগে উঠে। এই ছবির মধ্য দিয়ে শুরু হলো চলচ্চিত্রে নায়ক রাজ্জাকের যুগ। তার পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘ওরা ১১ জন’, এসএম শফির ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’, বাবুল চৌধুরীর ‘প্রতিশোধ’ এবং কাজী জহিরের ‘অবুঝ মন’ ছবিতে অভিনয় করে রাজ্জাক হয়ে যান বাংলাদেশী সিনেমার আইকন।

১৯৭৩ সালে জহিরুল হকের ‘রংবাজ’-এ নাম ভূমিকায় অভিনয় করে রাজ্জাক বাংলা সিনেমার নতুন ধারা প্রবর্তন করেন। তিনি সূচনা করেন আধুনিক অ্যাকশন যুগেরও। ‘রংবাজ’ দিয়েই রাজ্জাক তাঁর অভিনয় জীবনে বৈচিত্র নিয়ে আসেন। ‘রংবাজ’ ছবির সাফল্যের পর তাঁর (রাজ্জাকের) মনে হলো, দর্শকদের একঘেয়েমি থেকে মুক্ত রাখতে হলে সব ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। প্রয়োজনে দর্শকদের জন্য নিজের অর্থে ছবি নির্মাণ করতে হবে। তিনি তা-ই করলেন।

প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আগে রাজ্জাক আরো কিছু বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করেন। যেমন; ‘বেঈমান’, ‘অনির্বান’, ‘স্লোগান’, ‘ঝড়ের পাখি’, ‘আলোর মিছিল’, ‘এখানে আকাশ নীল’, ‘অতিথি’, ‘অবাক পৃথিবী’, উল্লেখযোগ্য।

‘শুধু অ্যাকশান বা রোমান্টিক নয় ত্রিরত্নের মতো কমেডি ছবিতেও অভিনয় করেন রাজ্জাক। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো দর্শকদের আনন্দ দেওয়া। আজিজুর রহমানের ‘অতিথি’ ছবিতে তিনি সেক্রিফাইসিং চরিত্রে অভিনয় করেন। এসময় নায়ক আলমগীর নতুন অভিনেতা। তাকে তুলে ধরার জন্য শাবানার সঙ্গে রোমান্টিক চরিত্রে রাজ্জাক মিলিয়ে নিয়েছেন। অনুরূপ ভাবে নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’ সিনেমায় তিনি ফারুককে রোমান্টিক চরিত্রে মেনে নিয়েছেন। কারণ, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নতুন নায়ক হলে নিজের উপর কিছুটা চাপ কমবে। ধীরে ধীরে নতুনদের ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। তাঁদের জনপ্রিয়তা আর ব্যস্ততার বিষয়টি রাজ্জাকের মনে প্রশান্তি আনে। ঢাকার সিনেমায় নায়ক রাজের এমন অবদাব স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১৯৭৪ সালে নতুন পরিচালক মাসুদ পারভেজ পরিচালিত ‘মাসুদ রানা’য় অতিথি শিল্পী হিসেবে একটি গানের দৃশ্যে অভিনয় করেছেন। এতে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন সোহেল রানা, তার জীবনেও এটি প্রথম ছবি। ছবিটিতে ‘মনের রঙে রাঙাবো, বনের ঘুম ভাঙাবো’ গানের সাথে নেচে গেয়ে আরেকজন নতুন শিল্পীর উত্তরণে কিছুটা হলেও ভূমিকা রেখেছেন। অথচ এই সময় তিনি যে অবস্থানে ছিলেন কোনো নতুন নায়কের ছবিতে অতিথি শিল্পী হিসেবে কাজ করার কথা নয়। বর্তমান প্রজম্মের কোনো জনপ্রিয় নায়ক তাঁর মতো করবে না। আর রাজ্জাক করার কারণ হচ্ছে আমাদের চলচ্চিত্র জগতে নায়ক নায়িকাদের সংখা বাড়িয়ে চলচ্চিত্রকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

অভিনেতা হিসেবে নিজেকে অন্য সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজ্জাককে তেমন কোনো কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়নি। রাজ্জাক বরাবরই মানুষকে যথাযোগ্য সম্মান আর ভালোবাসা দিয়েছেন। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নামীদামী প্রযোজক-পরিচালকদের সম্মানে পার্টির আয়োজন করেছেন বছরের পর বছর।

রাজ্জাকের স্ত্রী লক্ষী রাত জেগে স্বামীর বন্ধুদের পছন্দ মতো রান্নাবান্না করে খাইয়েছেন। নির্মাতারাই তাঁকে নিয়েছেন- ‘বাদি থেকে বেগম’, ‘সমাধি’, ‘কি যে করি’, ‘সেতু’, ‘আগুন’-এর মতো জনপ্রিয় ছবির সেরা চরিত্রে।

এক সময় পরিচালকগণ মনে করতেন পর্দায় নায়ক মারা গেলে সিনেমা চলবেনা। ঠিক এমন সময়ই ‘বেঈমান’, ‘সমাধি’ আর ‘সেতু’ সিনেমার শেষ দৃশ্যে রাজ্জাক মৃত্যুবরণ করেন, এতে দর্শকদের খুব কষ্ট দিয়েছেন ঠিকই তবে ছবির সাফল্যও আদায় করে নিয়েছেন।
বর্তমানে বাংলা ছবির নায়ক মানেই চকচকে শার্ট-প্যান্ট, স্যুট-টাই পরা। কিন্তু ঐ সময় রাজ্জাক অভিনয় করতেন ছাপার লুঙ্গি পরে। চরিত্রের প্রয়োজনটা বোঝার ক্ষমতাটাই রাজ্জাককে নায়করাজে পরিণত করেছে।

১৯৭৭ সালে রাজ্জাক যখন পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, তখন তিনি বেছে নেন প্রেমের গল্পকে। নির্মাণ করেন ‘অনন্ত প্রেম’ এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন ববিতা। গল্প, গান, চিত্রায়ন, অভিনয় সবকিছু মিলিয়ে তারা দর্শকদের যা উপহার দিয়েছেন দর্শক কি তা কখনো ভূলতে পারবে? প্রেমের ছবির মূলমন্ত্র হচ্ছে মান অভিমান, প্রেম ভালোবাসা এবং সর্বশেষে মিলন। এসব ছবি দেখে দর্শক হাসতে হাসতে ঘরে ফিরতেন। কিন্তু ‘অনন্ত প্রেম’ সিনেমায় নায়ক-নায়িকার মৃত্যু দিয়ে ছবি শেষ করেও সাফল্য অর্জন করে রাজ্জাক প্রমান করেছেন পরিচালক হিসাবেও তিনি দর্শকের মন জয় করতে পারেন।

তার পর ‘বদনাম’, ‘সৎ ভাই’, ‘চাপাডাঙ্গার বউ’ এবং ‘বাবা কেন চাকর’ নির্মাণ করে পরিচালক হিসিবে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করে নেন। বিশেষ করে তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাপাডাঙ্গার বউ’ নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি অভিনেতা রাজ্জাককে বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্রে শাবানার বিপরীতে এটিএম শামসুজ্জামানকে নিয়ে একজন অভিনেতার মহত্ব প্রমাণ করেছেন।

এই ছবিটির প্রযোজক রাজ্জাক, পরিচালকও তিনি, এই ছবিতে ঐ সময়ের জনপ্রিয় নায়িকা শাবানাকে নিয়েছেন নাম ভূমিকায়, পূত্র বাপ্পারাজকে দিয়েছেন নায়ক হিসেবে এবং যাত্রা সম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাসের কন্যা অরুনা বিশ্বাকেও নিয়েছেন নায়িকা হিসাবে। অথচ তিনি ইচ্ছা করলে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতে পারতেন, প্রধান চরিত্রে নিয়েছেন খল অভিনেতা তাঁর বন্ধু এটিএম শামসুজ্জামনকে। এখানেই পরিচয় হয় রাজ্জাকের অতুলনীয় এবং দূর দৃষ্টি সম্পন্ন মনোভাব।

অভিনেতা রাজ্জাকের বৈচিত্রময় সাহসী চরিত্রে অভিনয়ের কথা স্মরনীয় হয়ে আছে। ১৯৭৮ সালে রাজ্জাক যখন খুবই জনপ্রিয়, তখনও তিনি আজিজুর রহমানের ‘অশিক্ষিত’ সিনেমায় গ্রামের পাহারাদার চরিত্রে অভিনয় করেছেন লুঙ্গি আর শার্ট পরে, যা আজো ভুলবার নয়। সিনেমার শেষ প্রযায়ে মাস্টার সুমনের মৃত্যু পর পুলিশের খাতায় রাজ্জাকের স্বাক্ষর করার দৃশ্য আজো মনে পরলে চোখে পানি এসে যায়।
এর দুই বছর পর একই পরিচালক আজিজুর রহমানের ‘ছুটির ঘণ্টা’ সিনেমায় স্কুলের দপ্তরির চরিত্রে রাজ্জাকের অসাধারণ অভিনয় কি মন থেকে মুছে ফেলা সম্ভব? বড় কথা ওই সময় যে অবস্থানে থেকে রাজ্জাক পাহারাদার কিংবা স্কুলের দপ্তরির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সেটা আজকের কোনো জনপ্রিয় নায়কের কাছ থেকে আশা করা যায়?

এদিকে আবার দিলীপ বিশ্বাসের ‘জিঞ্জির’ মতিন রহমানের ‘অন্ধ বিশ্বাস’ সিনেমার দুর্দুরান্ত অভিনেতার গুন এখনকার নায়কদের মাঝে খুজে পাওয়া দুষ্কর। সবচেয়ে বড় কথা রাজ্জাক খুব ভালো করে জানতেন দর্শক কখন কী চায়, দর্শকের চাহিদা কী। তার ‘বদনাম’ ছবিতে তিনি জাফর ইকবালের হিট গান “হয় যদি বদনাম হোক আরো’ ছবিটি ব্যবসা সফল হয়। তিনি খুব চৌকুশ ছিলেন যে কখন কাকে দিয়ে কোন চরিত্রে অভিনয় করাতে হবে বা কাকে দিয়ে কোন কাজ করাতে হবে। যার ফলে তিনি চলচ্চিত্রের খারাপ সময়েও ‘বাবা কেন চাকর’ ছবির মাধ্যমে তিনি ঢাকাই সিনেমার চেহারা পালটিয়ে দেন। এটি দ্বিতীয় বার কলকাতায় চালিয়েও সাফল্য অর্জন করেন।

রাজ্জাক ছোট থেকেই সম্রাটকে সিনেমায় নিয়ে আসেন। রাজ্জাক তার দুই পুত্র বাপ্পারাজ এবং সম্রাটকে নিয়ে এক সঙ্গে অভিনয় করেছেন ‘কোটি টাকার ফকির’ ছবিতে। দুই ছেলেকে নিয়ে অভিনয় করাটাকেই রাজ্জাক তাঁর জীবনের সেরা প্রাপ্তি হিসেবে মনে করেছেন। তিনি বলতেন, ‘আমার কোনো অপ্রাপ্তি নেই। সবকিছুই আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। তবে একটা কষ্ট আছে, সেটা হলো আমার বড়মেয়ে শম্পার অকাল মৃত্যু। ও বেঁচে থাকলে আমরা সম্পূর্ণ এবং পরিপূর্ণ পরিবার নিয়ে গর্ববোধ করতে পারতাম’।

আবদুর রাজ্জাক থেকে যে মানুষটি একজন নায়ক রাজ রাজ্জাকে পরিনত হন, তিনি হচ্ছেন সেই দিনের কমলাপুরের ছোট্ট ঘর থেকে গুলশানের আলিশান বাড়ি, খ্যাতি, সম্মান, অর্থ, যশ, দর্শকদের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সিনেমার প্রতিটি মানুষের শ্রদ্ধা স্নেহ-ভালোবাসা পাওয়ার পিছনে অর্থাৎ আবদুর রাজ্জাক থেকে নায়ক রাজ হয়ে উঠার পিছনে যে সব মহৎ ব্যক্তিদের অবদান রয়েছে তাদের সম্পর্কে তিনি বলে গেছেন-
‘‘আমার আজকের এই অবস্থানের পিছনে যাদের অবদান রয়েছে তাদের মধ্য আছেন আবদুল জব্বার খান, জহির রায়হান, আজহারুল আনোয়ার, নজরুল ইসলাম, আবদুল লতিফ বাচ্চু, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুভাষ দত্ত, আজিজুর রহমান, আমজাদ হোসেন, চাষী নজরুল ইসলাম এবং বন্ধু মজিবুর রহমান চৌধুরী মজনু। এদের সহযোগিতা না পেলে আমি আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারতাম না। কৃতজ্ঞতা জানাই তাঁদেরকে যাদের ছবিতে আমি জাতীয় চলচ্চিত্র ও বাচসাস পুরস্কার পেয়েছি। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই প্রযোজক-পরিবেশক একেএম জাহাঙ্গীর খানকে যিনি আমাকে শরৎচন্দ্রের গল্প অবলম্বনে দুটি ছবি ‘চন্দ্রনাথ’ ও ‘শুভদা’তে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। বন্ধু পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম এই দুই ছবির বাইরেও আমাদের নিয়ে ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’ নামে আরো একটি সাহিত্য নির্ভর ছবি নির্মান করেছেন।’’ অর্থাৎ সাবাই তাঁকে নায়ক রাজ হতে সাহায্য করেছেন।

নায়ক রাজ রাজ্জাক বাংলাদেশ চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ‘চ্যানেল আই চলচ্চিত্র মেলা-২০০৯’-এ তার পুরো পরিবারকে সম্মাননা প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এই চলচ্চিত্র মেলা ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে তিনি স্বপরিবারে অংশ নিয়েছিলেন। শুধু বাপ্পারাজ দেশের বাহিরে থাকার কারণে তখন উপস্থিত হতে পারেনি। অনুষ্ঠানে সেসময়কার তথ্য সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী রাজ্জাক পরিবারের হাতে সম্মাননা তুলে দেন।

রাজ্জাক অভিনীত পরিচালিত ছবি ১৮টি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছবি হচ্ছে- ‘অনন্ত প্রেম’, ‘মৌ চোর’, ‘বদনাম’, ‘আমি বাঁচতে চাই’, ‘কোটি টাকার ফকির’, ‘মন দিয়েছি তোমাকে’ এবং ‘উত্তর ফাল্গুনী’। তার নির্মিত সর্বশেষ ছবি হচ্ছে ‘আয়না কাহিনী’।

রাজ্জাক বাংলা উর্দু মিলিয়ে প্রায় ৫০০ টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় রেছেন। তিনি শুধু নায়ক হিসাবে নয়। একজন পরিচালক হিসাবেও সফল। সিনেমার বাইরে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করেছেন নায়করাজ রাজ্জাক। তার প্রযোজনা সংস্থার নাম রাজলক্ষী প্রোডাকশন। রাজ্জাকের দুই পুত্র বাপ্পারাজ এবং সম্রাট চলচ্চিত্র অভিনেতা।

একনজরে নায়করাজ রাজ্জাক…
তাঁর পুরো নাম আব্দুর রাজ্জাক। ডাক নাম রাজু, রাজ্জাক, রাজা। তিনি ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জের নাগতলায় জম্ম গ্রহন করেন। তার পিতার নাম আকবর হোসেন এবং মাতার নাম নিসারুন নেসা। রাজ্জাকের তিন ভাই তিন বোন তাদের মধ্যে তিনি ছোট। তিনি সর্বপ্রথম কলকাতার শিলালিপি নামে একটি ছবিতে অভিনয় করেন।
১৯৬২ সালে খায়রুন নেসাকে (লক্ষ্মী) বিয়ে করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি প্রথম ঢাকায় আসেন। তিন পুত্র (বাপ্পারাজ, বাপ্পি, সম্রাট) দুই কন্যা (শম্পা, ময়না) এবং স্ত্রী খায়রুন নেসাকে নিয়ে কলমা পুর বসতি স্থাপন করেন।
রাজ্জাক নায়ক হিসাবে প্রথম ‘বেহুলা’ সিনেমায় অভিনয় করেন। তার সর্বপ্রথম প্রযোজিত সিনেমা ‘আকাঙাক্ষা’ এবং পরিচালক হিসাবে প্রথম সিনেমা ‘অনন্ত প্রেম’। এই পর্যন্ত তার অভিনীত মোট ছবির সংখ্যা প্রায় ৫০০। রাজ্জাকের সেরা প্রাপ্তি ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হওয়া। তার খ্যাতি নায়ক রাজ রাজ্জাক।
২০১৭ সালের ২১শে আগস্ট তিনি পরলোকগমন করেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়