মঙ্গলবার, ১৬ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

ওয়াসিম এর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

অ্যাকশন ও ফোক-ফ্যান্টাসী ছবির অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক

বাংলা চলচ্চিত্রের অ্যাকশন ও ফোক-ফ্যান্টাসী ছবির অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক ওয়াসিম এর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ২০২১ সালের ১৮ এপ্রিল, দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগে, ঢাকার শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। প্রয়াত চিত্রনায়ক ওয়াসিম এর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

চিত্রনায়ক ওয়াসিম (আসল নাম মেজবাহউদ্দীন আহমেদ) ১৯৪৭ সালের ২৩ মার্চ, চাঁদপুর জেলার মতলব-্এর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম.এ ডিগ্রী সম্পন্ন করেন।
কলেজের ছাত্রাবস্থায় ‘বডি বিল্ডিার’ হিসেবে বেশ নাম করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে, বডি বিল্ডিং এর জন্য ‘মিঃ ইস্ট পাকিস্তান’ খেতাব-এ ভূষিত হয়েছিলেন ওয়াসিম।

চিত্রপরিচালক এস এম শফি পরিচালিত ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে ঢাকার চলচ্চিত্রজগতে আসেন ওয়াসিম। এই ছবির ছোট্ট একটি দৃশ্যে অভিনয়ও করেন তিনি। নায়ক হিসেবে তাঁর প্রথম ছবি মহসিন পরিচালিত ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রাতের পর দিন’। এই ছবিতে তাঁর নায়িকা ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রনায়িকা ববিতা।

পরের বছর ওয়াসিম অভিনীত ‘ডাকু মনসুর’, ‘কে আসল কে নকল’, ও ‘জিঘাংসা’ চলচ্চিত্রগুলো ব্যবসায়িকভাবে সফলতা অর্জন করে। ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ইবনে মিজান নির্মিত ‘দুই রাজকুমার’ চলচ্চিত্রটির অসামান্য সাফল্যে রাতারাতি তারকাখ্যাতি অর্জন করেন ওয়াসিম। পেয়ে যান সুপারহিট নায়কের তকমা। ১৯৭৬ সালে মুক্তিপায় এস এম শফি পরিচালনায়, ওয়াসিম-অলিভিয়া অভিনীত ‘দি রেইন’ (যখন বৃষ্টি এল) চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীর কাছে, জনপ্রিয় চিত্রনায়ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বাংলা ও উর্দু, দুই ভাষায় নির্মিত ‘দি রেইন’ চলচ্চিত্রটি সেই সময়ে পৃথিবীর ২৬টি দেশে মুক্তি পেয়েছিল।

ওয়াসিম অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো– আকাশ কুসুম, দুশমন, জানোয়ার, বাহাদুর, জীবন মরণ, জীবনসাথী, দোস্ত দুশমন, রাজদুলারী, আসামী হাজির, মহেশখালীর বাঁকে, রাজমহল, গুনাহগার, বারুদ, বন্দুক, বুলবুল-এ বাগদাদ, শীষনাগ, ঈমান, চন্দ্রলেখা, বেদ্বীন, লুটেরা, মোকাবোলা, রাজকন্যা, ওমরশরীফ, শাহী দরবার, আকাশপরী, শাহাজাদী গুলবাহার, ওস্তাদ সাগরেদ, কুদরত, আবেহায়াত, প্রাণসজনী, তিন বাহাদুর, সওদাগর, ধন দৌলত, বানজারান, পদ্মাবতী, ভাগ্যলিপি, প্রিন্সেস টিনা খান, রসের বাইদানী, নরম গরম, জালিম, চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, রাজিয়া সুলতানা, লাল মেমসাহেব, জিপসী সর্দার, রাজদণ্ড, দুলারী, ধর্ম আমার মা, আয়নামতি, নূরী, শিরি ফরহাদ, ডাকু ও দরবেশ, চাচা ভাতিজা, চন্দনা ডাকু, উনিশ বিশ, দিদার, প্রতিবাদ, রঙ্গীন জরিনা সুন্দরী, সেতুবন্ধন, মান-মর্যাদা, ঈমানদার, পর্বত, জবরদস্ত, সুখের স্বপ্ন, বাহার, মরনপণ, আগুন পানি, হিসাব চাই, জীবনধারা, বিধাতা, ছলনা, আঁচলবন্দী, আলাল দুলাল, রঙ্গীন সাগরভাসা, দুই বোন, কসম, তাকদিরের খেলা, বন্যা, গংগা যমুনা, মোহন বাঁশী, জবানবন্দী, আসমান জমিন, প্রতিঘাত, আজাদ, দিনকাল, জনি ওস্তাদ, আখেরী হামলা, মাটির দুর্গ, নাগপঞ্চমী, জুলুমের বদলা, ডাকাত, ক্ষুধা, মুখোশ, ভালবাসা ভালবাসা, মালেকা সুন্দরী, সোনার ময়না পাখি, সাথী তুমি কার, একশো কোটি টাকা, বকুল ফুলের মালা, অরুন শান্তি, ধনী গরীবের প্রেম, মুসা ভাই, ময়না মতির সংসার ইত্যাদি ।

অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছিলেন।

ব্যাক্তিজীবনে নায়ক ওয়াসিম বিয়ে করেছিলেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী রোজী’র ছোট বোনকে। তাদের দুই সন্তান- পুত্র দেওয়ান ফারদিন এবং কন্যা বুশরা আহমেদ। ২০০০ সালে তাঁর স্ত্রীর অকালমৃত্যু ঘটে। ২০০৬ সালে ওয়াসিম এর কন্যা বুশরা আহমেদ মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পাঁচতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। তাঁর একমাত্র পুত্র ফারদিন লন্ডনের কারডিফ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ব্যারিস্টার হিসেবে আইন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে সহকারী পরিচালক হয়ে এসে একসময়ে তুমূল জনপ্রিয় চিত্রনায়ক হয়ে যান ওয়াসিম। হয়ে যান সুপারহিট চিত্রতারকা। একেরপর এক অভিনয় করে গেছেন সব বাণিজ্যসফল চলচ্চিত্রে। একটানা ৫০টিরও বেশী ‘সুপার হিট’ চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন তিনি। তখনকার সময়ে অ্যাকশন ও ফোক-ফ্যান্টাসী ছবির অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক ছিলেন ওয়াসিম।
এমনও সময় গেছে, নায়ক ওয়াসিম যখন এফডিসি’র স্টুডিওতে হেঁটে যেতেন, পেছনে প্রযোজক-পরিচালকদের লাইন লেগে থাকতো। যদি তাঁর একটু শিডিউল পাওয়া যায়, এই আশায়। ওই সময়ে তাঁর শিডিউল পাওয়া ছিল সোনার হরিণের মতো। এমন মহা ব্যস্ত নায়ক ছিলেন তিনি।

তাঁর অভিনীত বহু ব্যাবসাসফল সব ছবি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন অনেক প্রযোজক-পরিচালক। অনেকের গাড়ি হয়েছে, বাড়ি হয়েছে। নায়ক ওয়াসিমও হয়েছেন জনপ্রিয়, সমাদৃত। আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প বাণিজ্যিকভাবে হয়েছে সমৃদ্ধ।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে বাণিজ্যিকভাবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এক সফল চিত্রনায়কের নাম ওয়াসিম। আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নায়ক ওয়াসিম- চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

চিত্রজগত/স্মরণীয় বরণীয়

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়