শুক্রবার, ৩১শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

আব্দুল জব্বার খান: যাঁর হাত ধরে আমাদের দেশে বাংলা সবাক পূর্ণদৈর্ঘ চলচ্চিত্রের সূচনা হয়

যাঁর হাত ধরে আমাদের এই ভূ’খন্ডে বাংলা সবাক পূর্ণদৈর্ঘ চলচ্চিত্রের সূচনা হয়েছিল, উন্মোচিত হয়েছিল চলচ্চিত্র নির্মানের নতুন এক সম্ভাবনার দিগন্ত, তিনি আবদুল জব্বার খান। বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের জনক আবদুল জব্বার খান-এর ২৮তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ। তিনি ১৯৯৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর (২৮ ডিসেম্বর রাত ১২টার পর), ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। বাংলাদেশের সবাক চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ আব্দুল জব্বার খান-এর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। তাঁর প্রতি অন্তহীন শ্রদ্ধা জানাই।

আব্দুল জব্বার খান ১৯১৬ সালের ১৬ এপ্রিল, আসামের গোলকগঞ্জের, দফরপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পৌত্রিক নিবাস বিক্রমপুরের লৌহজং থানার উত্তর মসদগাঁও। পিতার নাম হাজী মোহাম্মদ জমশের খান এবং মা মোসামৎ আব্বান খাতুন। আসামের ধুবড়ী এলাকায় তাঁর বাবা পাটের ব্যবসা করতেন। সেখানেই শৈশবে তিনি স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলে পড়া অবস্থায় তিনি নিয়মিত মঞ্চনাটক করেছেন। নবম-দশম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই নাটকের মূল চরিত্রে অভিনয় করতেন তিনি।

আব্দুল জব্বার খান ১৯৪১ সালে, আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে ডিপ্লোমা নিয়ে চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন। ঢাকায় এসে সংগঠিত করেন ‘কমলাপুর ড্রামাটিক এসোসিয়েশন’। এ সংগঠনের উদ্যোগে তিনি ‘টিপু সুলতান’ ও ‘আলীবর্দী খাঁ’ নাটক মঞ্চায়ন করেন। পরে তিনি- ঈসাখাঁ, প্রতিজ্ঞা, ডাকাত, দেবলা দেবী, সিন্ধু বিজয়, চিরকুমার সভা, মাটির ঘর, বংগবর্গী, মেঘমুক্তি, শক্তির মন্ত্র , মীরকাশিম , কেদার রায়, মাটির মানুষ , মিশরকুমারী ,বাংলার প্রতাপ, পলাশী, বীর রাজা, রাতকানা, বেজায় বগড়, বৃস্টি বাবা সতীতীর্থ, নারী ধর্ম, ছেড়াতাঁর, রাজা রানী’সহ অনেক নাটক রচনা করেন।

আব্দুল জব্বার খান ১৯৫৩-তে নিজের রচিত ‘ডাকাত’ নামক নাটক অবলম্বনে বাংলাদেশের প্রথম সবাক বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণ শুরু করেন, চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৫৬ সালের ৩ আগষ্ট। পরবর্তিতে তিনি আরো যেসব চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন- জোয়ার এলো, নাচঘর, বাঁশরী, কাঁচ কাটা হীরে এবং খেলাঘর।

১৯৭১ সালে আব্দুল জব্বার খান আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়, মুজিবনগর সরকারের চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেন।
তিনি ‘পপুলার ষ্টুডিও’র অংশীদার ছিলেন। সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র জুরি বোর্ড, অনুদান কমিটি, সেন্সর বোর্ড, ফিল্মস ইন্সটিটিউট এবং ফিল্ম আর্কাইভে। তিনি ষাটের দশকে গঠিত পাকিস্তান প্রযোজক সমিতির অন্যতম সংগঠক এবং নেতা ছিলেন।

আব্দুল জব্বার খান চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য- বাচসাস বিশেষ পুরষ্কার, এফডিসির রজতজয়ন্তী পদক, হীরালাল সেন স্মৃতি সংসদ এবং বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন স্বর্নপদক লাভ করেন। ২০০২ সালে, বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। তাঁর সম্মানার্থে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘আব্দুল জব্বার খান স্মৃতি পাঠাগার’।

যেখানে এ দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের অবকাঠামো থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি, শ্যুটিংফ্লোর, এডিটিং মেশিন কিছুই ছিল না!সেখানে চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দেয়া কঠিনতম দুঃসাহসী কাজই ছিল বটে। সেই দুঃসাহসী কাজটিই, অতি সাহসিকতা ও কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করেছিলেন আবদুল জব্বার খান।

বহু গুণে গুণান্বিত, অসাধারণ প্রতিভাবান আবদুল জব্বার খান, একাধারে অভিনেতা-চিত্রপরিচলক- প্রযোজক- পরিবেশক-নাট্যকার-চলচ্চিত্রের কাহিনী ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আবদুল জব্বার খান একটি কিংবদন্তী নাম। এই নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে- অনন্তকাল।

চিত্রজগত/স্মরণীয় বরণীয়

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়