বৃহস্পতিবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

সুচিত্রা সেনের নবম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সুচিত্রা সেন -এম এ কুদ্দুস (কার্টুনিস্ট) -- চিত্রজগত.কম

সুচিত্রা সেন। মায়াবী অভিনয়, দুর্দান্ত স্টাইল আর অসাধারণ এক্সপ্রেশন নৈপুণ্যে নিজেকে বসিয়ে গেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তির আসনে। তিন বছর হয়ে গেল তিনি নেই। ২০১৪ সালের এই দিনে বেশ কিছুদিন ধরে জীবন-মৃত্যুর লড়াই শেষে বাঙালির হৃদয়ের এ মহানায়িকা চলে যান না ফেরার দেশে।

বাংলা চলচ্চিত্রের অসামান্য এ সুন্দরী তার এক্সপ্রেশন ও স্টাইলকে ছুটি দিয়ে মৃত্যুর আগে থেকে ৩৫ বছর ধরে চলচ্চিত্র জগৎকে বিদায় জানিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে। তারপর আর জনসমক্ষে আসেননি। কিন্তু ২৫ বছরের চলচ্চিত্র জীবনেই তিনি অসামান্য অভিনয়ের স্বাক্ষর রেখে গেছেন তার অভিনীত ৬০টি ছবিতে। এর মধ্যে ৫৩টি বাংলা ছবি এবং ৭টি হিন্দি ছবি।

তিনি বাংলা ছবির এক নতুন ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন। আর উত্তম কুমারের সঙ্গে তার জুটি বাঙালির মনে রোমান্টিক গাঁথা হয়ে চিরকাল রয়ে গেছে। তিনিই প্রথম বাংলা ছবির নায়িকা, যিনি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (১৯৬৩) ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিলেন। জাতীয় স্তরে হিন্দি ‘দেবদাস’ ছবিতে পারোর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার (১৯৫৫)। তাকে পদ্মশ্রী সম্মানও দেয়া হয়েছে।

চলচ্চিত্রে সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার দেয়ার জন্য ২০০৫ সালে তার নাম মনোনীত হয়েছিল। কিন্তু তিনি জনসমক্ষে এসে ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এ সম্মান নিতে অস্বীকার করায় তাকে আর তা দেয়া যায়নি। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১২ সালে তাকে বঙ্গবিভূষণ সম্মানে সম্মানিত করেছিল।

বাংলাদেশের পাবনার মেয়ে রমা দাশগুপ্তের কিংবদন্তি নায়িকা সুচিত্রা সেন হওয়ার কাহিনীটি বেশ চমকপ্রদ। ১৯৩১ সালের ৬ই এপ্রিল পাবনায় তার জন্ম। তিনি ছিলেন আট ভাইবোনের মধ্যে মেজো। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন স্থানীয় একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বাবার বড় আদরের ছিলেন তিনি। তার ডাকনাম ছিল কৃষ্ণা। ছোটবেলায় লেখাপড়াও পাবনাতেই। পাটনায় মামার বাড়িতেও কিছুদিন থেকেছেন।

অসামান্য সুন্দরী হওয়ায় মাত্র ১৬ বছর বয়সেই কলকাতার বিশিষ্ট শিল্পপতি প্রিয়নাথ সেনের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। অনেকটা জেদের বশেই বিয়ে করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই বিয়ে বেশি দিন টেকেনি।

নিত্যনতুন অশান্তির কালোমেঘ সরাতে অবশ্য সময় নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবি যখন করছেন তখনই ডিভোর্স হয়ে যায়। এ ছবিটি ছিল তার জীবনের সেই সময়েরই প্রতিচ্ছবি। ছবিতে একটি দৃশ্যে সুচিত্রা রাগে সৌমিত্রের জামা ছিঁড়ে দিয়েছিলেন। এ ঘটনাটি শুটিংয়ের দিনে তার বাড়িতেই হয়েছিল। কথাকাটাকাটির জেরে স্বামীর জামা ছিঁড়ে চলে এসেছিলেন সোজা শুটিংয়ে।

সুচিত্রার সিনেমায় নামা কিন্তু তার নিজের ইচ্ছাতে নয়। স্বামী দিবানাথই জোর করেছিলেন সুচিত্রা যাতে অভিনয় করেন। সিনেমার জন্য প্রথম টেস্ট দিতে গিয়ে ডাহা ফেল করেছিলেন সবার মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। অবশ্য তখনও তিনি রমা সেন। ততদিনে জেদ চেপে বসেছে। অভিনেত্রী হবেনই। পরে অবশ্য স্ক্রিনটেস্টে উতরে গিয়েছিলেন।

শুরু হয় তার চলচ্চিত্রে অভিনয় জীবন। ১৯৫২ সালে প্রথম ছবি ‘শেষ কোথায়’। কিন্তু সেই ছবি মুক্তি পায়নি। মুক্তি পাওয়া প্রথম ছবি ১৯৫৩ সালের ‘সাত নম্বর কয়েদি’। এ ছবিতেই রমা সেন পরিবর্তিত হয়েছিলেন সুচিত্রা সেনে। ছবির পরিচালক সুকুমার দাশগুপ্তের সহকারী নিতীশ রায়ই নতুন এ নামটি দিয়েছিলেন। তবে প্রথম উত্তম কুমারের সঙ্গে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ই ব্রেক এনে দিয়েছিল। তারপর থেকে সুচিত্রা সেন নিজের জেদ ও অধ্যবসায়ে বাঙালির হৃদয়ের রানীতে পরিণত হয়েছিলেন।

১৯৫৩ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে একের পর এক সাড়া জাগানো ছবি করেছেন। তার ম্যানারিজমকে পর্যন্ত বাঙালি আপন করে নিয়েছে। ‘ওরা থাকে ওধারে’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘উত্তর ফালগুনি’, ‘শাপমোচন’, ‘শিল্পী’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘হারানো সুর’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘সূর্যতোরণ’, ‘সাগরিকা’, ‘সপ্তপদী’ এমন অসংখ্য ছবিতে সুচিত্রা সেনের অভিনয় তার সময়কে ছাপিয়ে গিয়েছিল। আর তাই তিনি সহজেই কিংবদন্তি নায়িকায় পরিণত হয়েছিলেন।

উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, বসন্ত চৌধুরী সবার বিপরীতে অভিনয় করলেও উত্তম কুমারের সঙ্গে যে ৩০টি ছবি করেছেন তাতে সুচিত্রা-উত্তম জুটির রোমাঞ্চ এতটাই স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্য ছিল, কখনো তা অভিনয় বলে মনে হয়নি। আর দু’জনের এই রসায়নের কারণেই মেয়ে মুনমুন সেন পর্যন্ত একবার মাকে বলেছিলেন, মা তোমার উত্তম কুমারকে বিয়ে করা উচিত ছিল। শুনে সুচিত্রা শুধু হেসেছিলেন।

সুচিত্রা বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দি ছবিতেও অভিনয় করেছেন। ১৯৫৫ সালেই ‘দেবদাস’ করেছেন। দোনন্দকে নিয়ে করেছেন ‘বোম্বাই কা বাবু’ ও ‘সরহদ’। আর গুলজারের পরিচালনায় ‘আঁধি’ ছবিতে ইন্দিরা গান্ধীর চরিত্রে তার অভিনয় সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।

তবে নিজের সম্পর্কে অসম্ভব সচেতন ছিলেন সুচিত্রা। আর তাই ১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ ছবিটি দর্শক ভালভাবে না নেয়ায় সুচিত্রা সেন সিনেমাকে বাই বাই জানাতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করেননি। তার ধারণা হয়েছিল পাবলিক প্রত্যাশা আর পূরণ করতে পারবেন না। সেই থকেই তিনি চলে গিয়েছিলেন অন্তরালে।

চিত্রজগত ডটকম/স্মরণীয় বরণীয়

সংশ্লিষ্ট সংবাদ