শুক্রবার, ৩১শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

সিরাজগঞ্জের সিনেমা হলগুলোর হালচাল

ছাত্রাবাস-গোডাউন কিংবা প্রাইভেট ক্লিনিকে পরিণত!

সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার একসময়ের বিনোদন প্রাণকেন্দ্র ‘লক্ষ্মী’ সিনেমা হল -- চিত্রজগত.কম

দর্শক বিমুখ হওয়ায় একে একে বন্ধ হয়ে গেছে সিরাজগঞ্জ জেলার সবগুলো সিনেমা হল। মানসম্মত সিনেমা নির্মাণ না হওয়ার কারণেই হলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে একসময়ের বিনোদনের সবচেয়ে বড় এই মাধ্যম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সিরাজগঞ্জের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। একই সঙ্গে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অসংখ্য মানুষ, হল সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা হারিয়েছেন সেই ব্যবসার জৌলুস।

বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘মমতাজ সিনেমা হল’

করোনা সংক্রমণ শুরু হলে সর্বশেষ বন্ধ হয়ে যায় সিরাজগঞ্জের দেড়শ বছরের পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী ‘মমতাজ সিনেমা হল’। ব্যবসা না থাকায় বন্ধ করে দেওয়া ৩৪টি সিনেমা হলের অধিকাংশই এখন ছাত্রবাস, গোডাউন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা গুদামঘর হিসেবে ব্যবহার করছেন বা ভাড়া দিয়েছেন হল মালিকেরা। প্রান্তিক জনগণের বিনোদনের বৃহৎ এই মাধ্যমটি পুনরুজ্জীবিত করতে দর্শকপ্রিয় সিনেমা নির্মাণের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন দর্শক, সংস্কৃতি কর্মী, কলাকুশলী ও হল মালিকরা।

সরেজমিন সিনেমা হলগুলো ঘুরে, সিনেমা হল মালিক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় শুধুমাত্র সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকাতেই ছিল ‘নীলা’, ‘লক্ষ্মী’, ‘গোধুলি’, ‘মমতাজ’ ও ‘মৌসুমী’ নামে ৫টি সিনেমা হল। এছাড়াও জেলার বেলকুচি উপজেলায় ১১টি, উল্লাপাড়ায় ৫টি, শাহজাদপুরে ৬টি, কাজিপুরে ৩টি, রায়গঞ্জে ২টিসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ৩৩ লাখ মানুষের বিনোদন চাহিদা পুরণে গড়ে উঠেছিল আরও অন্তত ২৯টি সিনেমা হল। কিন্তু বর্তমানে এসব নতুন প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্পের মতো। দর্শক না থাকায় লোকসানের শিকার হয়ে একে একে বন্ধ হয়ে গেছে জেলা সদরের পাঁচটিসহ জেলার সবগুলো সিনেমা হল।

এর মধ্যে শহরের ঐতিহ্যবাহী ‘মমতাজ সিনেমা হল’-এর একাংশে বর্তমানে করা হয়েছে ছাত্রাবাস এবং বাকিটুকুতে গুদাম ভাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ‘গোধুলি সিনেমা হল’ এখন প্রাইভেট ক্লিনিক, ‘মৌসুমী সিনেমা হল’কে নিয়ে এখনো পরিকল্পনা করেননি কতৃপক্ষ। এছাড়াও জেলার প্রায় সবগুলো সিনেমা হলেই এখন কোনো না কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, নয়তো করা হয়েছে নিজস্ব গোডাউন বা গুদাম ঘর হিসাবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

‘মমতাজ সিনেমা হল’ সর্বশেষ করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার অজুহাতে বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। দর্শক নেই তাই আয়ও নেই, কিন্তু চলে সকল খরচ। তাই কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য দেনার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্ধ করে দেয়া হয়। হলগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় একদিকে যেমন বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ, অপরদিকে কর্মহীন হয়ে পড়েছে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

একসময় নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই সিরাজগঞ্জের সিনেমা হলগুলোতে দর্শকদের ভিড় সামলাতে হল মালিকরা দ্বারস্থ হতেন পুলিশ প্রশাসনের। কিন্তু মানসম্মত সিনেমা নির্মাণ না হওয়ায় দিন দিন দর্শকেরা সিনেমা হল বিমুখ হয়ে পড়েছে। বিনোদনের বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে ইউটিউব, মোবাইল বা টেলিভিশনে বিদেশি চ্যানেলগুলোকে।


বন্ধ হয়ে গেছে মৌসুমী সিনেমা হলটিও

বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন রুখতে ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিনোদন চাহিদা পুরণে বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলো পুনরুজ্জীবিত করার বিকল্প নেই বলে অভিমত সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাদের। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুনভাবে সিনেমা হলগুলো সাজাতে স্বল্পসুদে ব্যাংক ঝণ, প্রণোদনা প্রদান, বিদ্যুৎ বিল কমানো ও সুষ্ঠুধারার মানসম্মত সিনেমা নির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার দাবি সিনেমা হল মালিকদের।

শহরের প্রাচীনতম সিনেমা হল ‘লক্ষ্মী’র ঠিক সামনেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোকাদ্দেস আলী দোকান। প্রায় ৩৭ বছর হলো এই স্থানে পান-সিগারেট, চিপস-পানীয় ধরনের পণ্য নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে আসলেও সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন ভালো নেই তিনি।

ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘৮-১০ বছর হলো সিনেমা হলটি বন্ধ হয়ে গেছে। এর পর থেকে বেচা-কেনা কমে গেছে প্রায় ৯০ ভাগ। আগে প্রতিদিন যা বিক্রি করতাম এখন এক মাসেও সেটা বিক্রি করতে পারি না। যে জায়গাগুলো মানুষের পদচারণায় পূর্ণ থাকত সেই জায়গাগুলো আজ ময়লার স্তুপে পরিণত হয়েছে।’ বন্ধ হয়ে যাওয়া হলগুলোর পাশের সব দোকানির অবস্থাও তার মতো বলে জানান তিনি।

‘মমতাজ সিনেমা হল’-এর ব্যাবস্থাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিনিয়ত লোকসানের কারণে কর্মচারিদের বেতন বকেয়া, বিদুৎ বিল বকেয়া হয়ে যাওয়ায় মালিক হল বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে আমরা যেমন কর্মহীন হয়ে পড়েছি, তেমনি জেলার হল বিনোদনের শেষ অবলম্বনটাও হারিয়ে গেছে। এখন মালিক বাধ্য হয়েই হলের একাংশে ছাত্রাবাস করেছেন ও বাকি অংশটুকু গুদাম ভাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘সরকার স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি ভালো মানের সিনেমা নির্মাণ হলে আবারও হলটি চালু করা সম্ভব হবে। তা না হলে এভাবে কোনো হল মালিকই সিনেমা হল টিকিয়ে রাখতে পারবেন না।’

সিরাজগঞ্জ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি আসাদ উদ্দিন পবলু বলেন, ‘দর্শকপ্রিয় গল্পের সিনেমা নির্মাণ ও লোকসানের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হল মালিকদের প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা প্রদানের বিকল্প নেই। আমরা আশা করি আবারও সিনেমা হলগুলোকে দর্শকমুখর করে তুলতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার।’

সিরাজগঞ্জ জেলা কালচারাল অফিসার মাহমুদুল হাসান লালন বলেন, ‘সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলার বিনোদনের প্রধান দিকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। ভালো গল্প না থাকায় ভালো মানের সিনেমা নির্মাণ হচ্ছে না। একমাত্র ভালো গল্পের সিনেমাই পারবে দর্শকদের হলমুখী করতে, হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে। এর জন্য সিনেমা সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’

চিত্রজগত/চলচ্চিত্র

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়