মঙ্গলবার, ১৬ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

আজ তাঁর ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী

সত্য সাহা: সঙ্গীতজগতের বিস্ময়কর এক প্রতিভার নাম

বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের বিস্ময়কর এক প্রতিভা ছিলেন তিনি। অসংখ্য চলচ্চিত্রের সুপারহিট, জনপ্রিয়, কালজয়ী গানের সুরস্রষ্টা। তিনি কিংবদন্তী সঙ্গীতজ্ঞ- সত্য সাহা। এই মানুষটির আজ ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ১৯৯৯ সালের ২৭ জানুয়ারি, ৬৫ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।
প্রয়াণ দিবসে সত্য সাহা’র বিদেহী আত্মার প্রতি অন্তহীন শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।

১৯৩৪ সালের ২৫শে ডিসেম্বর সত্য সাহার জন্ম হয় উত্তর চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলাধীন নন্দীরহাট জমিদার বংশে। নন্দীহাট গ্রামের জমিদার প্রশন্ন কুমার সাহার প্রথম স্ত্রীর ২ পুত্র ১ মেয়ের মাঝে সত্য সাহা, প্রেম বিনয়, ভূষণ সাহা, মেয়ে রাজ নন্দিনী, দ্বিতীয় স্ত্রীর দুই ছেলে অমিয় ভূষণ সাহা, সুনীতা ভূষন সাহা, মেয়ে নিলু সাহা, চৈত্রা সাহা। ১৯৪৬-১৯৪৮ এর মাঝামাঝি সময়ে সত্য সাহা নারায়ণগঞ্জ রামকৃষ্ণ স্কুল থেকে এণ্ট্রান্স পাশ করেন এবং ১৯৫১ ও ১৯৫২ সালে ভারতের কলকাতা বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন।

স্কুলে অধ্যয়নকালেই পন্ডিত সুপর্ণা নন্দীর কাছে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে তালিম গ্রহণ করেন তিনি। এ সময় ভজন গানেও কিছু পারদর্শিতা অর্জন করেন।
১৯৫৬ সালে বাংলাদেশ বেতারের সুরকার পঞ্চানন মিত্রের সহকারী হয়ে সঙ্গীতে কাজ শুরু করেন। ১৯৬১-তে তিনি বেতারে কন্ঠশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

সত্য সাহা পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে ভারতের কলকাতায় কয়েকটি ছবিতে সহকারী সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ ছবিতে প্রথমে গায়ক হিসেবে ঢাকার চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন। সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে প্রথম কাজ শুরু করেন আলী মনসুর পরিচালিত ‘জানাজানি’ ছবিতে, কিন্তু সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম কাজ ‘সুতরাং’ (১৯৬৪) ছবিতে।

সত্য সাহা’র সুর ও সঙ্গীতে যেসব চলচ্চিত্র নির্মিত হয় তারমধ্যে- সুতরাং, জানাজানি, রূপবান, ১৩নং ফেকু ওস্তাগর লেন, ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো, ভাওয়াল সন্ন্যাসী, চাওয়া পাওয়া, গুনাই বিবি, আয়না ও অবশিষ্ট, মোমের আলো, এতটুকু আশা, বাঁশরী, সাইফুল মুলক বদিউজ্জামাল, মধুমালা, পরশমণি, অপরিচিতা, চেনা অচেনা, মোমের আলো, কাগজের নৌকা, আবির্ভাব, চোরাবালি, পদ্মানদীর মাঝি, নায়িকা, সূর্য উঠার আগে, নীল আকাশের নিচে, মায়ার সংসার, পালাবদল, সন্তান, আলিঙ্গন, দীপ নেভে নাই, বিনিময়, ছদ্মবেশী, পিতাপুত্র, নতুন প্রভাত, রং বদলায়, আমার বউ, অন্তরঙ্গ, মানুষ অমানুষ, সাধারণ মেয়ে, সমাধান, মানুষের মন, জীবন সঙ্গীত, অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, স্বীকৃতি, স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা, অতিথি,অপবাদ, পরিচয়, আলোর মিছিল, ধন্যিমেয়ে, হারজিৎ, চাষীর মেয়ে, জীবন সাথী, গড়মিল, আসামী, বন্ধু, মধুমিতা, দাবী, সতী নারী, অবাক পৃথিবী, অলংকার, শাপমুক্তি, নয়ন মনি, সূর্যকন্যা, অমর প্রেম, লাঠিয়াল, জালিয়াত, পালংক, সেতু, মা, রূপালি সৈকতে, আনারকলি, সমাধি, বসুন্ধরা, জয়পরাজয়, মণিহার, আকাঙ্ক্ষা, অশিক্ষিত, অগ্নিশিখা, মাটির ঘর, বদলা, ওয়াদা, শহর থেকে দূরে, অংশিদার, সোনার তরী, জিঞ্জির, স্বামী, সুখে থাকো, মেহমান, ছুটির ঘণ্টা, মাটির ঘর, লাল সবুজের পালা, সোনারতরী, অংশীদার, জনতা এক্সপ্রেস, লাল কাজল, পুরস্কার, মায়ের আঁচল, বাসর ঘর, মেহমান, পরাণ পাখি, ইনসাফ, গুনাই বিবি, অপেক্ষা, রঙ্গীন রূপবান, সন্ধি, বীরঙ্গনা সখিনা, রাম রহিম জন, শ্বশুর বাড়ী, দেবর ভাবী, আগুনের পরশমণি, অজান্তে, ক্ষুদা, তপস্যা, উল্কা, দীপু নাম্বার টু, চুড়িওয়ালা অন্যতম। এছাড়া তিনি বেশকিছু টেলিভিশন নাটকেরও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন।

সত্য সাহা সুরারোপিত জনপ্রিয় ও কালজয়ী গানের মধ্যে- ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’, ‘এমন মজা হয় না গায়ে সোনার গয়না’, ‘তুমি আসবে বলে, কাছে ডাকবে বলে’, ‘নীল আকাশের নীচে আমি রাস্তা চলেছি একা’, ‘আমার মন বলে তুমি আসবে’, ‘সাতটি রঙ এর মাঝে আমি মিল খুঁজে না পাই’, “তোমারই পরশে জীবন আমার ওগো ধন্য হলো’, ‘জানতাম যদি শুভঙ্করের ফাঁকি’, ‘চেনা চেনা লাগে তবু অচেনা’, ‘দুঃখ আমার বাসর রাতের পালঙ্ক’, ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম’, ‘বন্ধু তোর বরাত নিয়ে আমি যাব’, ‘এই পৃথিবীর পরে কত ফুল ফোটে আর ঝড়ে’, ‘কোন কিতাবে লেখা আছে গো হারাম বাজনা গান’, ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’, ‘ঐ দূর দূরান্তে’, ‘মাগো মা ওগো মা’, ‘আমি যে আঁধারে বন্দিনী’, ‘ঢাকার শহর আইসা আমার’, ‘মাষ্টারসাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’, ‘আমি যেমন আছি তেমন রবো, বউ হবো না রে’, ‘আমার নায়ে পার হইতে লাগে ষোল আনা’, ‘একদিন ছুটি হবে অনেক দূরে যাব’, ‘হারজিৎ চিরদিন থাকবেই’, উল্লেখযোগ্য।

আধুনিক গান ও লোকসঙ্গীতেও তাঁর সুরদক্ষতা, শ্রোতাদেরকে আকৃষ্ট করেছে সমানভাবে। সত্য সাহা কয়েকটি ছবিতে নেপথ্যকন্ঠও দিয়েছেন। ‘তোমার আমার’, ‘দুই দিগন্ত’, ‘গোধূলীর প্রেম’, ‘আবির্ভাব’, ‘দীপ নিভে নাই’, ‘জিঞ্জির’সহ বেশকয়েকটি চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন তিনি।

সত্য সাহা বেশকটি ছবি প্রযোজনাও করেছেন- ‘বিনিময়’, ‘অশিক্ষিত’, ‘সাম্পানওয়ালা’, ‘ছুটির ঘন্টা’, ‘উজান ভাটি’, ‘পুরষ্কার’, চরমপত্র, রাম রহিম জন, অন্যতম। তাঁর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম, ‘স্বরলিপি বানিচিত্র’। এছাড়া তিনি ‘রাম রহিম জন’ নামে একটি ছবি পরিচালনাও করেন।

সত্য সাহা তাঁর কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি যেসব ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ সুর-সঙ্গীত পরিচালকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন- ১৯৯৪ সালে ‘আগুনের পরশমণি’, ১৯৯৬ সালে ‘অজান্তে’ এবং ২০০১ সালে ‘চুড়িওয়ালা’।
২০১৩ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন সত্য সাহা।

ব্যক্তিজীবনে তিনি রমলা সাহা’র সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুই পুত্র সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে সুমন সাহা, এক সময় শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, সুমন সাহা’কে নায়ক করে সত্য সাহা ১৯৮৯ সালে নির্মাণ করেন ‘রাম রহিম জন’ চলচ্চিত্রটি। তাঁর ছোট ছেলে ইমন সাহা আামাদের চলচ্চিত্রের স্বনামধন্য সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক।

গুণী এই সুরস্রষ্টা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও অবদান রেখেছেন। তিনি ১৯৭১-এ কলকাতায় ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্রশিল্পী ও কুশলী সমিতি’তে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই সময়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের উদ্যোগে ‘লিবারেশন ওয়ার ফিল্মস’ নামে চারটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়- ‘স্টপ জেনোসাইড’, ‘এস্টেট ইজ বর্ণ’, ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ এবং ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই চারটি চলচ্চিত্রেরই সংগীত পরিচালনা করেন সত্য সাহা।
একজন মেধাবী সৃজনশীল সুরস্রষ্টা হিসেবে সত্য সাহা, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে তথা সঙ্গীতশিল্পে চির অমর হয়ে থাকবেন।

চিত্রজগত/ঢালিউড

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়