শুক্রবার, ৩১শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

মঞ্চে দ্যুতি ছড়াবে দুই ‘স্বর্ণবোয়াল’

ইউসুফ হাসান অর্ক নির্দেশিত ‘স্বর্ণবোয়াল’ নাটকের দৃশ্য। -- চিত্রজগত.কম

তিরমনের সাধ জেগেছে বেউলা বিলের অতিকায় মাছ স্বর্ণবোয়াল ধরার। চিরলি গাঙের এই মাছের গা চকচকে। যেন সোনা দিয়ে মাজা। চোখ থেকে বের হয় দ্যুতি। এই দ্যুতি নেশা ধরায় তিরমনের মাথায়। ভাদ্র মাসের ঝড় বয়। নিষেধ করে মা। কে শোনে কার কথা! এক ঝড়ের রাতে তিতকামারের বড়শি নিয়ে যাত্রা করে সে।

কেউ কি কোনো দিন এই বোয়াল ধরতে পেরেছে? না, একদম না। স্বর্ণবোয়াল ধরার এই যাত্রা শুরু তিরমনের দাদা জনম মাঝির কাল থেকে। ৬০ বছর বয়সে কোশা নৌকায় বসে ছিপ ফেলে বড়শিতে গেঁথেছিল মাছটিকে। কিন্তু এত বড় মাছ! কোশা নৌকাসহ জনম মাঝিকে টেনে নিয়ে গেছে গাঙের গভীরে।

রক্তে যাদের বয় মাছ ধরার নেশা, তাকি থামে? জনমের ছেলে খলিশাও ছোটে। কিন্তু তাকেও মৃত্যুর দ্বারে নিয়ে যায় এই স্বপ্নবোয়াল। বাবা আর দাদার মৃত্যুস্বাদও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না তিরমনের কাছে। এই স্বর্ণবোয়াল ধরবেই সে। এ যে তার অপার সাধনা। অবশেষে সেই ভাদ্রের রাতেই স্বর্ণবোয়াল ধরা দেয় ঠিকই, কিন্তু তীরে আসার আগেই আবার লাফ মেরে চলে যায় অথৈ পানির গভীরে।

সেলিম আল দীন এই কল্পনার স্বর্ণবোয়াল তৈরি করেছিলেন এক রূপকের আড়ালে মানবের জীবনভর সাধনা-সংগ্রামের কথা বলতে। জন্ম হওয়ার পরই মানুষ জীবনভর এমন এক স্বর্ণবোয়ালের পিছু ছুটেই মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছায়।

এই কল্পনার স্বর্ণবোয়াল ধরা দেবে এবার মঞ্চে। দুই নির্দেশক একই ‘স্বর্ণবোয়াল’ মঞ্চে আনছেন। সেলিম আল দীনের এই অমর রচনা ২৪, ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে মঞ্চায়িত হবে।

নাটকের দল থিয়েট্রেক্স তাদের ১০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে নাটকটি মঞ্চে আনার মাধ্যমে। জাঁদরেল অভিনয়শিল্পী আসাদুজ্জামান নূর ও ওয়াহিদা মল্লিক জলিসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের একঝাঁক শিক্ষার্থীকে নিয়ে নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন বিভাগের শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী। প্রথম দুদিন থাকছে এই নাটকের প্রদর্শনী।

আর ২৬ ফেব্রুয়ারি থাকছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ইউসুফ হাসান অর্কর নির্দেশনায় আবারও ‘স্বর্ণবোয়াল’। এটিতে অভিনয় করেছেন বিভাগের ৪৬তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা। দুই নির্দেশকের একই নাটক পরপর মঞ্চে আসায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে নাটকপাড়ায়।

কীভাবে এই কল্পনার বোয়াল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল সেলিম আল দীনের মনে? কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান গণমাধ্যমে লিখেছেন সে কথা। ২০০৬ সাল। তখন তিনি সেলিমের একান্ত সচিব। তার ভাষ্য মতে, ‘কেরামতমঙ্গল’ ও ‘হাতহদাই’ নাটক লেখার সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন শামসুল হক। তিনি সেলিমকে প্রায়ই তার মাছ ধরার নানা গল্প শোনাতেন। সেই গল্পই সেলিমের মনে মাছ নিয়ে নাটক লেখার গোড়াপত্তন করে।

এদিকে সেলিম আল দীন মাছ খেতে দারুণ ভালোবাসতেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরেই ধামরাই থানার ইসলামপুর নয়ারহাট বাজার। একদিন এই বাজার থেকেই একটি মাছ কিনলেন তিনি। যেটির গায়ের রং সোনার মতো চকচকে। এর কয়েক দিন পরে বেডরুমে শুয়ে আছেন সেলিম আল দীন। হঠাৎ তার কল্পনায় বাজার থেকে কেনা সেই স্বর্ণবোয়াল দেখা দেয়। তারপরে কলমে-কাগজে জীবন্ত হয়ে ওঠে তা।

সেলিম আল দীনের ‘স্বর্ণবোয়াল’-এর কথা উঠলে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বিখ্যাত রচনা ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’-এর কথা মনে পড়ে। মাছ শিকারি বুড়ো সান্তিয়াগো অতিকায় মার্লিন মাছটাকে

শিকার করে তীরে নিয়ে আসতে সক্ষম হন না। হাঙরের দল এসে সেটি খেয়ে নেয়। অবশিষ্ট থাকে কেবল মাছের কঙ্কাল। হেমিংওয়ে তার উপন্যাসে বুড়োর শিকারের লড়াকু মনোভাবকে তুলে এনেছেন। যেখানে বিয়জই মূল কথা। আর সেলিম বলতে চেয়েছেন, জয়-পরাজয়ের বাইরে মানুষের চিরন্তন ছুটে চলার এক অমোঘ বয়ান।

চিত্রজগত ডটকম/মঞ্চ

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়