মঙ্গলবার, ১৬ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

একটি গানের জন্মকথা

‘তোমারে লেগেছে এত যে ভাল চাঁদ বুঝি তা জানে’

'তোমারে লেগেছে এত যে ভাল’ গানের একটি দৃশ্যে রহমান-শবনম -- চিত্রজগত.কম

‘রাজধানীর বুকে’ এহতেশাম পরিচালিত ১৯৬০ সালের বাংলাদেশী নাট্য চলচ্চিত্র। এতে অভিনয় করেছেন রহমান, শবনম, চিত্রা সিনহা, সুভাষ দত্ত, নার্গিস, গোলাম মুস্তাফা ও আজিম। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় শবনম, সুভাষ দত্ত ও গোলাম মুস্তাফা’র।

চলচ্চিত্রটি ১৯৬০ সালের ২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তি পায়।

১৯৫৯ সালে এহতেশাম যখন এ দেশ তোমার আমার ছবি নির্মাণ করছিলেন তখন একটি নাচের দৃশ্যে কয়েকজন নৃত্যশিল্পী প্রয়োজন হয়। বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে যাওয়া নৃত্যশিল্পীর দলের মধ্যে ছিলেন শবনম। এহতেশাম তাকে ও রহমানকে প্রধান শিল্পী করে এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন রবিন ঘোষ ও ফেরদৌসী রহমান। গীত রচনা করেছেন কে জি মোস্তফা। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তালাত মাহমুদ। এই ছবির “তোমারে লেগেছে এত যে ভাল” গানটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ওই সময় থেকে শুরু করে এখন পর‌্যন্ত এটি বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের অন্যতম রোম্যান্টিক গানের একটি।

এ গানের নেপথ্য কাহিনী

সময় ১৯৫৬ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন কে জি মোস্তফা। কবির ভাষায়- পড়াশোনার পাশাপাশি কবিতার্চচা ছিল আমার। তৎকালীন বিভিন্ন সাময়িকী ও দৈনিকের পাতায় কবিতা লিখতাম। প্রখ্যাত কবি ও মেধাবী ছাত্র আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও আমি ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র। তিনি আমার দু’বছরের সিনিয়র। অন্য অনেকের মতো আমিও তাঁর গুণমুগ্ধ। একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, আমার কবিতায় গীতিময়তা খুব বেশি। গান লিখলে নাকি ভালো করতে পারবো। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই মূলত গান লেখার শুরু।

ভার্সিটিতে তখন সহপাঠী বন্ধুদের বেশ ক’জন সঙ্গীত চর্চা করতেন। তাদের অনেকেই আজ তারকা শিল্পী। মুস্তফা জামান আব্বসী, খন্দকার নুরুল আলম, কাজী আনোয়ার হোসেন, ফেরদৌসী বেগম, সৈয়দ আবদুল হাদী, নাজমুল হুদা বাচ্চু, আঞ্জুমান আরা বেগম প্রমুখ। বন্ধুবর মুস্তফা জামান আব্বাসী নিজেই সুর করে আমার লেখা একটি গান সর্বপ্রথম বেতারে প্রচার করেন। সেই থেকে গান লেখার প্রতি ঝোঁক বাড়তে থাকলো। কাঁচা হাতের লেখা সেইসব গান শিল্পীবন্ধুরা সুর করতেন এবং ভার্সিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইতেন। বেতারেও কেউ কেউ গাইতেন। সেসময় বেতার ছিল একমাত্র প্রচার মাধ্যম। গীতিকার হিসেবে বেতারে তালিকাভুক্ত হওয়া ছিল বেশ কঠিন এক পরীক্ষা। এটা ছিল তখন এক দুর্লভ স্বীকৃতি। এরই মধ্যে গীতিকার হিসেবে সুনাম ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে।

সেই সুবাদে আচমকা আমন্ত্রণ এলো ‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রের গান লেখার জন্য। স্বনামধন্য পরিচালক এহতেশাম হায়দার চৌধুরী। সুরকার রবীন ঘোষ। কণ্ঠশিল্পী উপমহাদেশের তৎকালীন গজল সম্রাট তালাত মাহমুদ। উয়ারীতে রবীন ঘোষদের গোলাপি রঙের দোতলা বাড়ি। অভিনেতা আজিম (নূরুল আজিম খালেদ রউফ) আমাকে সেখানে নিয়ে গেলেন। আজিম ছিলেন রবীন ঘোষের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

আমাকে ছবির সিকোয়েন্স বুঝিয়ে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সুরের ওপর কথা বসাতে বললেন। শুনে তো আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এতদিন যা কিছু লিখেছি, সে তো মনের খেয়ালে। এখন এ যেন এক অগ্নিপরীক্ষায়। সবিনয়ে আমি আমার অক্ষমতা জানালাম। কিন্তু রবীন ঘোষ নাছোড়বান্দা।

ক্রমাগত উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। হারমুনিয়ামে বার বার সুরটা বাজিয়ে শোনাচ্ছেন। আমি ক্রমে নার্ভাস হয়ে পড়ছি। আমার সে কী অসহায় অবস্থা। যাহোক, কিছু একটা লিখতেই হবে। হোক বা না হোক। না হলে মুক্তি নেই। অবশেষে গানটার সুর ও সিকোয়েন্সের প্রতি কিছুটা মনোযোগ হলাম। যথাসম্ভব কাহিনীটা মাথায় রেখে সুরের ওপর কথা বসাতে চেষ্টা করলাম। প্রথম লাইন লিখলাম ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভাল চাঁদ বুঝি তা জানে।’ ভীষণ উৎসাহী হয়ে রবীন বললেন, পরের লাইন লিখুন…। লিখলাম রাতের বাসরে দোসর হয়ে/ তাই সে আমায় টানে”। এভাবেই সেদিন যে গানটি রচিত হয় এবং সঙ্গীত-জগতে গানটিকে মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই গান বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় গেয়েছেন কেউ? তখন তিনি বলেন, হ্যাঁ হিন্দি ভাষায়। এই ছাড়াও আমার অনেক গান হিন্দি, উর্দুসহ কয়েকটি ভাষায় ভাষান্তর হয়েছে। আমার জনপ্রিয় গানগুলো গেয়েছেন- উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী তালাত মাহমুদসহ দেশের খ্যাতিমান শিল্পীরা। কিন্তু তালাত মাহমুদ আর আমাকে বলা হতো ‘যুগলবন্দি’।

চিত্রজগত/চলচ্চিত্র

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়