মঙ্গলবার, ১৬ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

‘ডিপফেক’ ভিডিও কী, যেভাবে বুঝবেন এটা নিঁখুত মিথ্যা

ছবি সংগৃহীত। -- চিত্রজগত.কম

ধরুন, আপনার সামনে একটি ভিডিও আসলো যেখানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যাক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছেন। একদম হুবহু দেখতে, এমনকি তার গলার স্বরটিও অবিকল। সঙ্গত কারণেই আপনি বিশ্বাস করলেন এবং সেটি শেয়ার দিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানতে পারলেন ভিডিওটি সত্যি না, বানোয়াট।

অবাক করার বিষয় হচ্ছে, আপনি এখনো বুঝতে পারছেন না সেটি কেন বানোয়াট। একেই বলে সিন্থেটিক রিয়ালিটি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ডিপফেক বা নিঁখুত মিথ্যা।

সম্প্রতি বলিউড অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফ, দক্ষিণ ভারতের অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা এবং সর্বশেষ মার্কিন পপ সংগীত শিল্পী টেলর সুইফটের ডিপফেক ভিডিও নেট দুনিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সুইফটের ঘটনায় মার্কিন কংগ্রেস পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেছে। এরপরই আবারও আলোচনায় এই ডিপফেক বা নিঁখুত মিথ্যা।

সেলিব্রেটি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এই প্রযুক্তির অপব্যবহারের শিকার হচ্ছেন। ডিপফেক প্রযুক্তির সহায়তায় বিকৃত ছবি ও ভিডিও তৈরি করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে মানুষ সামাজিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ডিপফেক চেনাও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে এআইয়ের মাধ্যমে কারসাজি করা এই ধরনের ছবি ও ভিডিও তৈরি ৫৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে গত বছরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্নোগ্রাফিতে বিপুল পরিমাণ ডিপফেক ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের প্রায় ৯৯ শতাংশ কনটেন্টই তৈরি করা হয় নারীদের লক্ষ্য করে।

ডিপফেক শনাক্ত করবেন যেভাবে
ডিপফেক দিয়ে তৈরি অডিও, ছবি বা ভিডিও একেবারে নিখুঁত হয় না। তাই ভালোভাবে লক্ষ্য করলে ডিপফেক সাধারণত শনাক্ত করা যায়। ডিপফেক শনাক্ত করার সাতটি উপায় নিয়ে আলোচনা করা হলো—

১. ভিডিওর ক্ষেত্রে ব্যক্তির মুখের অভিব্যক্তি, চোখের পলক ও নড়াচড়ায় অসংগতি দেখা যায়। এই ধরনের ভিডিওতে ব্যক্তির হাত–পা বা মুখের আকার বদলে যেতে পারে। অর্থাৎ মুখ লম্বাটে বা চ্যাপ্টা লাগতে পারে।

২. মুখমণ্ডলের সঙ্গে ঠোঁট নাড়ানোর অসামঞ্জস্যতা পাওয়া গেলে ভিডিওটি নকল বলে ধরে নিতে হবে। সেই সঙ্গে যে শব্দগুলো উচ্চারণ করা হচ্ছে তার সঙ্গে ঠোঁটের নড়াচড়ার মিল নাও থাকতে পারে। আবার অডিওর সঙ্গে ঠোঁট মেলানোতে (লিপ সিঙ্ক) অসংগতি দেখা যেতে পারে।

৩. ভিডিওতে আলো ও ছায়া ঠিকমতো লক্ষ্য করুন। ডিপফেক কনটেন্টে আলো–ছায়াতে অসংগতি থাকতে পারে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বিষয়বস্তুর ছায়া থাকবে না, অথবা অন্য কোনো বস্তুর ছায়া দেখা যেতে পারে। আবার আলোর বিপরীতে যেখানে বিষয়বস্তুর ছায়া পড়ার কথা সেখানে নাও পড়তে পারে।

৪. মুখমণ্ডল, মাথার চুল বা থুতনির প্রান্ত ঝাপসা দেখা গেলে বুঝতে হবে এতে ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

৫. ডিপফেক ব্যবহারে বিষয়বস্তুর ব্যাকগ্রাউন্ডে অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে। ব্যাকগ্রাউন্ডের বিভিন্ন রং ও ছায়ায় অসংগতি থাকতে পারে।

৬. ডিপফেক দিয়ে তৈরি অডিওতে বিভিন্ন ধরনের অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। যেমন: অডিওতে ব্যাকগ্রাউন্ডে অন্য শব্দ বা নয়েজ শোনা যেতে পারে, বারবার অডিও আটকে যেতে পারে, কণ্ঠ একেকবার একেক রকম শোনা যেতে পারে।

৭. গাল এবং কপালের দিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করুন। ত্বক কি খুব মসৃণ বা কোঁচকানো মনে হচ্ছে? ত্বকে বার্ধক্যের ছাপের সঙ্গে চুল ও চোখে বার্ধক্যের ছাপের মিল আছে কি? ডিপফেক সাধারণত এ বিষয়গুলোতে সামঞ্জস্য রাখতে পারে না।

৮. চোখ এবং ভ্রুর মধ্যবর্তী ছায়া কি সঠিক স্থানে রয়েছে? ডিপফেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিখুঁতভাবে করতে ব্যর্থ হতে পারে।

৯. চশমার দিকে মনোযোগ দিন। চমশার কাচের ওপর আলো পড়লে যেভাবে চকচক করার কথা সেরকম কিছু কি আছে? ব্যক্তি নড়াচড়া করলে এই উজ্জ্বলতা কি কোণ পরিবর্তন করে? ডিপফেক আলোর স্বাভাবিক প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণরূপে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হতে পারে।

১০. মুখের লোম বা লোম না থাকার দিকে লক্ষ্য করুন। মুখের লোমগুলো কি বাস্তব মনে হচ্ছে? ডিপফেক গোঁফ, চোয়ালের লোম বা দাড়ি যোগ করতে পারে অথবা মুছে ফেলতে পারে। ডিপফেক সাধারণত মুখের লোমের রূপান্তর সম্পূর্ণরূপে বাস্তবসম্মত করতে ব্যর্থ হতে পারে।

১১. মুখের তিল বা আঁচিলের দিকে লক্ষ্য করুন। এটি কি বাস্তব মনে হচ্ছে?

১২. চোখের পলকের দিকে মনোযোগ দিন। ব্যক্তি কি অপর্যাপ্ত বা অত্যধিক মিটমিট করে? ডিপফেক ভিডিওতে চরিত্র সাধারণত অস্বাভাবিক পলক ফেলে।

১৩. ডিপফেক শনাক্তের টুল
ডিপফেক শনাক্তের জন্য অনলাইনে অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের টুল ও সফটওয়্যার পাওয়া যায়। ডিপওয়্যারের মতো ওয়েবসাইটে ডিপফেক ভিডিও আপলোড করে সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস, এমআইটি ডট এডু

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়