রবিবার, ১৪ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

আইন লঙ্ঘনে অভিযুক্ত তিন চলচ্চিত্র

ঢাকা মহানগরীর রাতের কাহিনী নিয়ে নির্মাণ হয়েছিল আলোচিত ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’। ভারতীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-তে প্রচারিত এই ওয়েব সিরিজ বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। পেয়েছিল জনপ্রিয়তাও। প্রকাশের এক বছর পর আবারও আলোচনায় ওয়েব সিরিজটি। তবে এবার ইতিবাচক নয়, আইন লঙ্ঘনে অভিযুক্ত হিসেবে।
মহানগর ওয়েব সিরিজে দেখানো হয়েছিল, চরম মানসিক চাপ নিয়ে থানার ভেতর একের পর এক ধূমপান করছেন ওসি হারুন চরিত্রে অভিনয় করা মোশারফ করিম। থানা কম্পউন্ডে পুলিশ হেফাজতেই ধূমপান করতে দেখা যায় আসামি আফনান চৌধুরীর চরিত্রের শ্যামল মাওলা এবং পুলিশের ওই জোনের এসি শাহানার চরিত্রে অভিনয় করা জাকিয়া বারী মমকেও। এইসব দৃশ্যের মাধ্যমে ধূমপানের প্রচারণা চালানো হয়েছে বলে মহানগর ওয়েব সিরিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।

শুধু মহানগর নয় একই অভিযোগের অভিযুক্ত আলোচিত চলচ্চিত্র ‘ঢাকা অ্যাটাক’ এবং ‘দেবী’। সম্প্রতি মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার এক সেমিনারে জানানো হয়, ঢাকা অ্যাটাক চলচ্চিত্রে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ছিলো একটি তামাক কোম্পানির। অপর তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞার গবেষণায় বলা হয়েছে, আইনে নিষিদ্ধ হলেও সরকারি অর্থায়নে নির্মিত ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের পোস্টারে ধূমপানের চিত্র প্রকাশ ও পুলিশ পরিবার কল্যাণ সমিতির বিনিয়োগে নির্মিত ‘ঢাকা অ্যাটাক’ চলচ্চিত্রের পোস্টারে একটি তামাক কোম্পানির সরাসরি লোগো দেখানো হয়েছে। যা ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন -২০০৫ অনুযায়ী দণ্ডণীয় অপরাধ।

এই আইনের ধারা ৫ এর (গ)তে বলা হয়েছে, তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বা উহার ব্যবহার উৎসাহিত করিবার উদ্দেশ্যে , কোন দান, পুরস্কার, বৃত্তি প্রদান বা কোনো অনুষ্ঠানের ব্যয়ভার (স্পন্সার) করিবে না বা করাইবে না। আইনের এই ধারা অনুযায়ী ঢাকা অ্যাটাক চলচ্চিত্রে একটি তামাক কোম্পানির স্পন্সার নেওয়া ও লোগো প্রদর্শনে আইন লঙ্ঘন হয়েছে। একই আইনের ধারা ৫ এর (ঙ) তে বলা হয়েছে বাংলাদেশ বা দেশের বাইরে নির্মিত কোনো সিনেমা, নাটক বা প্রামান্য চিত্রে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট, মঞ্চ অনুষ্ঠান বা অন্য কোনো গণমাধ্যমে প্রচার, প্রদর্শণ বা বর্ণনা কিরবেন না বা করাইবেন না। তবে কাহিনীর প্রয়োজনে অত্যাবশ্যক হলে সতর্কবানী প্রদর্শণ করার নির্দেশনা রয়েছে। দেবী ও মহানগর-এ এই আইনের অপব্যবহার করে সরাসরি পোস্টার, টেইলর এবং চলচ্চিত্রে অনেক বেশি ধূমপানের দৃশ্য দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টার্স্কফোর্স-এর সদস্য ও ঢাকা আহসানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য বিভাগ-এর পরিচালক ইকবাল মাসুদ বলেন, ‘মাহনগর’ যে নাটকটি করা হয়েছে সেখানে আমরা দেখেছি পুলিশের প্রধান চরিত্র ও নারী পুলিশ চরিত্রে যে দু’জন অভিনয় করেছেন তারা প্রত্যেকেই ধূমপায়ী। এবং তারা অফিসে বসে কাজের মধ্যে ধূমপান করেছেন। যা আইনত দণ্ডণীয় অপরাধ এবং কোনো সরকারি চাকরিজীবী অফিসে এভাবে ধূমপান করেন না। এখানে তারা দেখিয়েছেন যে মানসিক চাপ কমানোর জন্য ধূমপান তারা করছেন।

পুলিশের দায়িত্ব পাবলিক প্লেসে ধূমপানকারীকে আইনের আওতায় আনা। কিন্তু মহানগরে পুলিশকে যেভাবে ধূমপান করতে দেখানো হয়েছে এতে নিঃসন্দেহে বলা যায় পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। পুলিশকে আইন লঙ্ঘনকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে

ঠিক তেমনিভাবে আমরা দেখেছি যে সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের পোস্টারে বড় করে সিগারেটের ছবি দেওয়া হয়েছিল। যা পরবর্তীতে বিভিন্ন তামাকবিরোধী সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে পরিবর্তন করা হয়। আরেকটি চলচ্চিত্র ঢাকা অ্যাটাক, এই চলচ্চিত্রে তামাক কোম্পানির ম্পন্সার নেওয়া হয়েছে এবং সরাসরি প্রচারণা চালানো হয়েছে। এগুলো একেকটা আইন লঙ্ঘন।

নায়ককে ধূমপান করতে দেখে তরুণরা ধূমপানে উৎসাহিত হয় বলে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, পুলিশের দায়িত্ব পাবলিক প্লেসে ধূমপানকারীকে আইনের আওতায় আনা। কিন্তু মহানগরে পুলিশকে যেভাবে ধূমপান করতে দেখানো হয়েছে এতে নিঃসন্দেহে বলা যায় পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। পুলিশকে আইন লঙ্ঘনকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ বোর্ড-এর সদস্য অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, সে যখন অফিসার হিসেবে তার থানায় বসে ধূমপান করছেন এবং প্রতিটি দৃশ্যেই তার ধূমপানের দৃশ্য ছিল। এমন কোনো দৃশ্য বাকি নাই যেখানে এই পুলিশ কর্মকর্তার মুখে সিগারেট নেই। এটা অনেক বড় অপরাধ এবং আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো।

চলচিত্র একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কারণ মানুষ নায়কদের আইডল হিসেবে মানে। আপনি দেখেন বম্বে ছবিতে শাহরুখ খানের মুখে যখন একটি সিগারেট থাকে তখন তার ফলোয়ার বা তরুণ সমাজ মনে করে ধূমপানটা ক্ষতিকর কিছু নয়, বরং নায়ক হওয়ার মাধ্যম। এজন্য আমি মনে করি এ ধরনের দৃশ্য চলচ্চিত্রে না রাখাই শোভনীয়।

তিনি প্রশ্ন তুলেন, এভাবে ধূমপানের দৃশ্য দেখিয়ে চলচ্চিত্র কিভাবে সেন্সর বোর্ডে মুক্তি পায় সেটাই আমার বুঝে আসে না।

‘চলচ্চিত্রতো সমাজের মূল চিত্র তুলে ধরবে। সেখানে ধূমপানের দৃশ্য যেমন থাকবে তেমনি থাকবে ধূমপানের কারণে ক্যান্সার আক্রান্তের চিত্রও। সমাজ সংস্কারের দায়িত্বতো এককভাবে চলচ্চিত্র নিবে না’- দীপংকর দীপন

তবে ‘ঢাকা অ্যাটাক’ চলচ্চিত্রে তামাক কোম্পানির অর্থায়নের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি তরে পরিচালক দীপংকর দীপন বলেন, সাধারণত কোনো চলচ্চিত্রে কেউ অর্থায়ন করলে তার চাহিদার আলোকে কিছু দৃশ্য দেখাতে বলা হয়। কিন্তু ‘ঢাকা অ্যাটাকে’ আমাকে কোনো ধূমপানের দৃশ্য দেখাতে বলা হয়নি। আমার জানামতো এখানো কোনো তামাক কোম্পানির স্পন্সার ছিলো না।

পোস্টারে ওই কোম্পানির লোগে কেন দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। হয়তো প্রযোজক বলতে পারবেন। তবে আমি এটুকু বলতে পারি তামাক কোম্পানির চাহিদার আলোকে আমাকে কোনো দৃশ্য দেখাতে বলা হয়নি।

সিনিয়র এই চলচ্চিত্র পরিচালক প্রশ্ন তোলেন, তামাক উৎপাদন ঠোকানো হয় না, বিপনন ঠেকানো হয় না, সরকার তামাক থেকে বিশাল অঙ্কের ট্যাক্সও আয় করে তাহলে শুধু চলচ্চিত্রকে কেন সমাজ সংস্থাকারের দায় দেওয়া হবে?

‘ফিকশনকে ফিকশনের মতোই থাকতে দেওয়া উচিত। সবকিছুতে নিয়ম আরোপ করলে চলচ্চিত্র আর চলচ্চিত্র থাকবে না’- আশফাক নিপুণ

চলচ্চিত্রতো সমাজের মূল চিত্র তুলে ধরবে। সেখানে ধূমপানের দৃশ্য যেমন থাকবে তেমনি থাকবে ধূমপানের কারণে ক্যান্সার আক্রান্তের চিত্রও। সমাজ সংস্কারের দায়িত্বতো এককভাবে চলচ্চিত্র নিবে না- বলেন চলচ্চিত্র পরিচালক দীপংকর দীপন।

মহানগরের নির্মাতা আশফাক নিপুণ বলেন, এক রাতের গল্প মহানগর। মহানগরের ওই রাতে অনেক বেশি টেনশান। আর যারা স্মোকার তারা সাধারণত টেনশানে থাকলে ধূমপান বেশি করেন। যার জন্য হয়তো মনে হতে পারে ধূমপানের দৃশ্য বেশি দেখানো হয়েছে। কিন্ত খুব বেশি নয়, আধঘণ্টার চলচ্চিত্রে ৩ থেকে ৪ বার দেখানো হয়েছে। হয়তো কাছাকাছি সময়ে এসেছে বলে বেশি মনে হয়েছে। তবে আমি মনে করি শিল্পে এমন বার বার একেকটা নিয়ম আরোপ করার কোনো দরকার নেই।

আমাদের আসলে ফিকশনকে ফিকশনের মতোই থাকতে দেওয়া উচিত। সবকিছুতে নিয়ম আরোপ করলে চলচ্চিত্র আর চলচ্চিত্র থাকবে না- বলেন আশফাক নিপুণ।

আইন অনুযায়ী চলচ্চিত্রে ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শণে বিধিনিষেধ রয়েছে। চলচ্চিত্র অনুমোদনের ক্ষেত্রে আইনটিকে কতোটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং ওয়েব সিরিজে এসব দৃশ্য দেখানোর বিষয়ে সেন্সর বোর্ডের পদক্ষেপ কী জানতে চাইলে সবই মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিষয় বলে দাবি করেন বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ড-এর ভাইস চেয়ারম্যান মুহ. সাইফুল্লাহ।

মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে অপরাগতাও প্রকাশ করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা।

চিত্রজগত/চলচ্চিত্র

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই সপ্তাহের পাঠকপ্রিয়